09/06/2026
(১) Dr. .......... মৃত্যুর আগে মহিলা চিকিৎসকদের গ্রুপে পরিচয় গোপন করে পোস্ট করে লিখেছিলেন -
❝আমার ২ বছরের সন্তান আছে। তাকে নিয়েই সারাদিন থাকি।
সামনে FCPS ফাইনাল পরীক্ষা, কিন্তু পড়তে পারি না। কেউ সাহায্য করে না। আমার স্বামী ডাক্তার। সেও নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
বাসায় শাশুড়ির সঙ্গে থাকি। আমার শাশুড়ি আমার দেখা সবচেয়ে খারাপ মানুষগুলোর একজন। জানি না অন্যদের কাছে কেমন, তবে উনি শাশুড়ি হিসেবে খুবই খারাপ।
আমার সন্তান জন্মের পরের সময়টা (পোস্টপার্টাম পিরিয়ড) খুব কঠিন ছিল।
এখনও ডিপ্রেশন থেকে বের হতে পারি
নি। থেরাপি নিচ্ছি। খুব ব্যয়বহুল। আমার নিজের আয় না থাকায় নিয়মিত নিতে পারি না।
অনেক কথা কাটাকাটি হয়েছে, হাতাহাতিও হয়েছে। এক পর্যায়ে আমার স্বামী আমাকে বলেছিল, “ফকিন্নির বাচ্চা, দেখ তোর আশেপাশে কেউ নেই।”
এত গালাগালির মধ্যেও এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে। সত্যিই তো, আমার কেউ নেই।
শাশুড়ি অত্যাচার করলে বাবা-মা আমায় সাপোর্ট করে না, স্বামী অত্যাচার করলে কেউ আমায় সাপোর্ট করে না।
সবাই বলে, “এসব তো হয়ই। মেনে নাও।” সত্যিই আমি আসলেই একা।
ছোটবেলা থেকেই আমার মায়ের সিজোফ্রেনিয়া দেখে বড় হয়েছি। অনেক কষ্ট করে এত দূর এসেছি। এমবিবিএস করেছি, পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করতে চাই, কিন্তু পারছি না।
আমি আর বাঁচতে চাই না। রাগ করে অনেক ওষুধ খেয়ে ফেলেছি। প্রাণঘাতী কিছু নয়, হাতের কাছে যা পেয়েছি তাই খেয়েছি। কোনো প্রভাবও হচ্ছে না।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি কি ১০ মিনিটও নিজের জন্য পাব না? আল্লাহ আমাকে এমন ভাগ্য কেন দিলেন?❞
গত ৪ জুন ........... মারা যান। বলা হচ্ছে, হার্ট অ্যাটাক করে মারা গিয়েছেন। তাঁর শ্বশুর একজন বড় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, স্বামীও হৃদরোগের চিকিৎসক।
কোথায় যেন পড়লাম, ........ তিন দিন না খেয়ে ছিলেন। তাঁর মা গিয়ে দেখেন মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। এরপর হাসপাতালে নিলে মারা যান।
এই যে একটা ডাক্তার মেয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে গেলো, তাও একটি ডাক্তার পরিবারে।
মেয়েটি Post Graduate হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলো। স্ত্রী, পুত্র বধূ হিসেবে চেয়েছিলো একটু ভালোবাসা, আন্তরিকতা, একটু সাহায্যের। চেয়েছিলো নিজের চিকিৎসা করাতে। এর জন্যও শুনতে হয়েছিলো কটু কথা।
এটা কী স্বাভাবিক মৃত্যু? নাকি কাউকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মরে যেতে বাধ্য করা? এই হত্যার দায় কী এড়ানো যায়?
(২)
অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এই ঘটনা দেখার পর আমার এক ডাক্তারি পড়ুয়া ছোটবোনের কথা মনে পড়ে গেল। এত প্রাণচঞ্চল ছিল মেয়েটি। কত কথা হতো। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলত। একদিন ডাক্তার হবে, সবার চিকিৎসা করবে।
এই মেয়েটির একদিন এক ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ে হলো। প্রায় নয় মাস পর শুনি, সে আর নেই। গর্ভাবস্থায় কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিল। মা ও সন্তান, দুজনেই মারা যায়।
মেয়েটা বাচ্চাদের খুব ভালোবাসত। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাহায্য করত। একদিন এক শিশু হাফেজের দায়িত্ব নিতে আমাকে নক দিয়েছিল। এটাই ছিল আমাদের শেষ কথা।
ওর মৃত্যুর পর শুনেছিলাম, কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর তার ডাক্তার স্বামী তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেনি। অবহেলা করেছিল। বাসায় চিকিৎসা করতে রেখেছিল।
এরপর অবস্থা ভয়াবহ হয়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আইসিইউতে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা, তখনও তার স্বামী চিল মুডে। কোনো ভয়, শঙ্কা নেই। স্ত্রীর বান্ধবী যখন কাঁদতে কাঁদতে শেষ, তখন সেই বান্ধবীকে হাসতে হাসতে বলে, “চলো, ক্যান্টিনে খেয়ে আসি।”
মেয়েটার মৃত্যুর কয়েক মাসের মাথায় লাভ ম্যারেজ করেছিল তার ডাক্তার স্বামী। এটা শোনার পর বেশ খারাপ লেগেছিল। কীভাবে পারলো?
একটা মানুষ কী এমনও হয়? যার মধ্যে সদ্য স্ত্রী-সন্তান হারানোর কোনো শোক নেই।
মনে মনে বলেছিলাম, আল্লাহ! এই মেয়েটা তো এমন ভাগ্য ডিজার্ভ করে না। এমন এক ছেলের সঙ্গেই কেন ওর বিয়ে হলো!
যে মেয়েকে এত দয়া-মায়া দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলে, তার জন্য এমন নির্মম ভাগ্য কেন লিখলে?
(৩)
কদিন আগে এক ডাক্তার আপুর ছবিসহ একটি পোস্ট সামনে এলো। মেরে মুখের আকৃতি পর্যন্ত বদলে দিয়েছে তাঁর ডাক্তার স্বামী। চেহারা চেনা যাচ্ছে না। বেশ বড় বড় সন্তান আছে উনার।
কমেন্টে তাঁর ডাক্তার সহপাঠীরা লিখেছেন, “বিয়ের পর থেকেই তো মার খাচ্ছিস! আর কত? এত কিছুর পরও কেন ওর সঙ্গে সংসার করছিস? জেলের ভাত খাওয়াচ্ছিস না কেন?”
মানে, তাঁরা সবাই জানেন এই অত্যাচারের কথা। সাহায্য করতে চায়। কিন্তু আপু নিজেই ছেড়ে আসতে পারছেন না।
মানুষের মনের অসুখ খুব কঠিন অসুখ। এই অসুখ মেডিসিন দিয়ে দূর করা সহজ নয়। প্রয়োজন ভালোবাসার। যে মানুষটার সঙ্গে আজীবন একসঙ্গে থাকার শপথ নিয়েছিল, সেই মানুষটির কাছ থেকেই যখন শত কষ্ট ও অত্যাচার পায়, তখন সে কষ্টের সমুদ্রে ডুবে যায়।
তখন আশেপাশের মানুষকে হাতড়ে খোঁজে। সেই মানুষগুলো যদি হাতটা ধরে টেনে তোলে, সে প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু সেই মানুষগুলোও যদি হাত সরিয়ে নেয়, তাহলে তাকে উপরে টেনে তুলবে কে? সে তখন এই নিয়তিকেই মেনে নেয়।
আবার কেউ কেউ আছে, যারা কষ্ট পেতে পেতে কষ্টের সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। না পারে ছাড়তে, না পারে মরতে।
আশেপাশের মানুষ সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালেও, সেই হাত ধরে বেরিয়ে আসতে পারে না। এটাকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়। আর তখন চারপাশের মানুষের হাসির পাত্র হয়ে যায়। মানুষ আর তার কষ্ট দেখে “আহারে” বলে না, কটাক্ষ করে।
এই আপুর অবস্থাও হয়েছে ঠিক তেমন।
(৪)
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় আশ্রয় কোনো বাড়ি নয়, কোনো সম্পদ নয়, কোনো পদবীও নয়।
সবচেয়ে বড় আশ্রয় আরেকজন মানুষ। এমন একজন মানুষ, যার কাছে নিজের দুর্বলতা, ভয়, ব্যর্থতা আর কান্নাগুলো নির্ভয়ে তুলে ধরা যায়।
জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলো অনেক সময় অস্ত্র দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় অবহেলায়, অসম্মানে, তুচ্ছতাচ্ছিল্যে, না-বোঝার মধ্যে। মানুষের হৃদয় খুব অদ্ভুত। সে কষ্টের চেয়েও বেশি ভেঙে পড়ে তখন, যখন তার কষ্টকে কেউ গুরুত্ব দেয় না।
আমরা প্রায়ই ভাবি, ভালোবাসা মানে বড় বড় ত্যাগ, বড় বড় আয়োজন, বিশাল কোনো অনুভূতি। অথচ অধিকাংশ মানুষের প্রয়োজন খুব সামান্য। একটু সম্মান, একটু সময়, একটু মনোযোগ, আর কঠিন দিনে একটি হাত, যে হাত ছেড়ে যাবে না।
দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু ঝগড়া নয়। মতের অমিলও নয়।
সবচেয়ে বড় শত্রু হলো এমন এক দূরত্ব, যেখানে দুজন মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
একসময় কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়, তারপর অনুভূতি। শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক বেঁচে থাকে, কিন্তু মানুষের ভেতরের মানুষটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
আমরা মানুষকে বাঁচাতে পারি না, এমন দাবি করার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু আমরা একজন মানুষের জীবনকে আরও সহনীয় করতে পারি। আমরা তার কথা শুনতে পারি। তাকে বিচার করার আগে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি। তার কষ্টকে ছোট না করে, তাকে তার কষ্টের অধিকার দিতে পারি।
সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক সেই সম্পর্ক নয়, যেখানে কখনও ঝড় আসে না। বরং সেই সম্পর্ক, যেখানে ঝড় এলে দুজন মানুষ একে অপরকে দোষী না খুঁজে, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
দিনের শেষে মানুষ নিখুঁত কাউকে খোঁজে না। মানুষ খোঁজে নিরাপদ কাউকে। এমন কাউকে, যার পাশে দাঁড়িয়ে সে বলতে পারে -
"এই পৃথিবীটা খুব কঠিন। কিন্তু আমি পরোয়া করিনা, কারণ তুমি আমার পাশে আছো।"
হয়তো সুখী দাম্পত্যের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞাও এটাই - দুজন মানুষের এমন এক বন্ধুত্ব, যেখানে কেউ কারও কারারক্ষী নয়। কেউ কারও মালিক নয়; বরং দুজনই দুজনের আশ্রয়।
- অন্তর মাশঊদ
বিঃদ্রঃ এই লেখাটা বিশেষ কোন পেশা, লিঙ্গের প্রতি বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ করে লেখা নয়। লেখাটি শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত ভিক্টিম সম্পর্কে অবগত ও সচেতন করার উদ্দেশ্যে লেখা। যেকোন পেশার নারীরাই নির্যাতিত হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। আবার আমাদের সমাজে পুরুষরাও নির্যাতিত হয়। তা নিয়ে অন্য লেখায় লিখেছি।