13/09/2026
❝মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করলেও জীবনসঙ্গী বাছাই করতে বাজিমাৎ করলেন অনামিকা❞ -- সাংবাদিক সাহেব এমন শিরোনামেই সংবাদ বানিয়েছেন।
এভাবে সংবাদ পরিবেশন করে আপনারা আসলে কী বার্তা দিচ্ছেন?
খবরটি পড়ে মনে হলো, চীনা নাগরিককে বিয়ে করাটাই যেন একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন! সঙ্গে রোমান্টিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।
অথচ সংবাদটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো কোথায়?
মেয়েটি এ বছর মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করেছে, অপ্রাপ্ত্যবয়স্ক । তাহলে ৩২ বছর বয়সী একজন বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে তার বিয়ে কীভাবে হলো?
এই বিয়ে কোন কাজী বিয়ে পড়ালেন?
কোন রেজিস্টারে বিয়েটি নিবন্ধিত হলো?
বয়স যাচাই করা হয়েছিল কি?
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা কী ছিল?
প্রশাসন বিষয়টি জানত কি না?
জানলে তাদের পদক্ষেপ কী ছিল?
এসব প্রশ্ন নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদ হওয়ার কথা ছিল।
বাংলাদেশের অন্য কোনো এলাকায় বাল্যবিবাহের খবর পেলে দেখি প্রশাসন ছুটে যায়, বিয়ে বন্ধ করে, জরিমানা করে, মামলা হয়, বিষয়টি নিয়ে বড় বড় সংবাদও হয়।
তাহলে এই ঘটনায় সেই প্রশ্নগুলো কোথায়?
বিদেশি নাগরিক হলেই কি বাংলাদেশের আইনও বদলে যায়?
একটি অবৈধ বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন না করে বরং মেয়েটির প্রেমকাহিনি তুলে ধরে রোমান্টিক আবহ তৈরি করা হয়েছে।
বালপাকনা মেয়েটি সাংবাদিকদের বলছে -
‘আমার ছোটবেলা থেকেই একটু ইচ্ছে ছিল বাইরের দেশে সেটেলড হবো। যেহেতু আমি দেখলাম বাংলাদেশের অবস্থা খুবই খারাপ! তাই আমি মজা করে একটা অ্যাপ নামাই। ওর সঙ্গে পরিচয় হয়। আমাকে গার্লফ্রেন্ড হওয়ার জন্য প্রপোজ করে।’
বাহ! কী চমৎকার বার্তা!
দেশের অবস্থা খারাপ মনে হলো → একটা অ্যাপ নামালাম → বিদেশি ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলো → প্রেম → বিয়ে → বিদেশে সেটেলমেন্ট।
একজন উঠতি বয়সী মেয়ে যখন এমন সংবাদ দেখে, তখন তার কাছে বিষয়টি নিছক একটি বিয়ে থাকে না। ঐ মেয়েটির মনে তৈরি হয় একটি ধারণা। বিদেশি নাগরিককে বিয়ে মানেই উন্নত জীবন, গাড়ি, সুন্দর বাড়ি, আর বিদেশে সেটেলমেন্ট।
মাথামোটা মেয়েগুলো হয়তো বুঝবেই না, যেটাকে আমাদের দেশে বিলাসিতা মনে হয়, সেটা অন্য দেশে হয়তো একেবারেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বেসিক নিড।
আর এখানেই সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
কোথাও কোনো চীনা নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি মেয়ের বিয়ে হলেই আঞ্চলিক প্রতিনিধি যেন বুম হাতে দৌড়ে চলে যান। তারপর সেটি ধুমধাম করে প্রচার!
সংবাদ করুন। অবশ্যই করুন।
কিন্তু সঙ্গে এটাও দর্শকদেরকে জানান, বিয়ের ফাঁদে ফেলে চীনা নাগরিক দ্বারা এর কীভাবে মেয়েরা পাচার হয়, বিক্রি হয়, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। এসব সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্ক জানান।
আমি আগে ‘চীনা বিয়ে বিরোধী’ একটি লেখা লিখেছিলাম, যেটি কয়েক কোটি মানুষ পড়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল কাউকে অপমান করা নয়, বরং মেয়েদের সতর্ক করা। আমার পরিচিত যেই মেয়েটাকে সতর্ক করতে পোস্টটা করেছিলাম।
আজ সেই মেয়েটির টিকটকে প্রায় ২ লাখ ফলোয়ার্স। সত্যি বলতে সে খুব ভালোই আছে।
সে টিপস দেয় কীভাবে, কোন এপ্সে চীনা ছেলেকে বিয়ে করা যাবে। সে বাংলাদেশের ছেলেদেরকে ছোট করে ভিডিও বানায়। কেউ ওর এসবের বিরুদ্ধে কথা বললেও বাজে ভাষায় গালমন্দ করে। ইয়েস! সে এখন টিকটক সেলেব্রেটি।
কিন্তু এই একজনের সুন্দর জীবন দেখে, চীনা বিয়ে করলে আপনার নিজের জীবনও এতটা সুন্দর হবে। তা ভাবলেই কিন্তু ধরা।
ঐ ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে কী ঘটে তা কিন্তু আপনি জানেন না।
কমনসেন্স যাদের আছে তারা বুঝবে। ৯৯% দিন আনে দিন খায় টাইপের পরিবারের মেয়েরাই কেন এদের টার্গেট হয়?
এমনও কেস দেখেছি এরা কাজের বুয়াকেও বিয়ে করে নিয়ে যায়। চেহারা সুরুত, শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক স্ট্যাটাস, কিছুর ধার ধারে না। মেয়ে হলেই হলো।
দু একজন মেয়ের টিকটকে আনন্দময় জীবন দেখে নাচতে নাচতে আমারও চাইনিজ জামাই চাই। এই চিন্তা মাথায় আনা আর নিজেকে বিপদে ফেলা একই কথা।
২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানে ২ বছরে ৬০০ অধিক মেয়েকে বিয়ের নামে পাচার করে বিক্রি করলে সেই দেশের সরকারের টনক নড়ে। ওরা শক্ত অবস্থান নেয়। সেখানে বেশীরভাগ দরিদ্র খ্রিস্টান ধর্মের মেয়েকে টার্গেট করতো। আমাদের সরকারের টনক এখনও কেন নড়ছে না?
এদের টার্গেট দেশ: বাংলাদেশ, নেপাল, ভারতে, পাকিস্তানের দরিদ্র বা লোভী মেয়েগুলো! যাদের পটানো অনেকটা সহজ। ঐ দেশগুলোতে স্ক্যাম করা খুব কঠিন হয়ে যাওয়ায় এখন বাংলাদেশকেই এরা সবচেয়ে নিরাপদ ভাবছে। ওদের আসা তো বন্ধ হচ্ছে না? হচ্ছে কী?
চীনারা কখনও নিজ দেশে আকাম কুকাম করতে পারে না। ওদের দেশের আইন খুব কঠিন। ভয়ঙ্কর সাজা দেওয়া হয়। নিজ দেশ বাদে ওরা দুনিয়ার সবদেশেই আকাম কুকাম করে।
গত বছর ২৫শে মে, ঢাকার চীনা দূতাবাস থেকে সতর্ক করে দিয়েছে চীনা নাগরিকদের ভালোবাসা, বিয়ে এবং অন্যান্য বিষয়ে।
এসব নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে বহুদিন ধরেই। সরকার এই ব্যাপারে স্পষ্ট ও উপযুক্ত কোন ব্যবস্থা এখনও গ্রহণ করেনি। এসব ব্যাপারে সতর্ক করতে সরকার, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং মিডিয়ায় শক্ত প্রচারনা প্রয়োজন।
গরীব হোক, লোভী হোক, এরা আমাদের দেশেরই সন্তান। এদেরকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। এদের একজনের দ্বারা আরও ১০টা মেয়ে ম্যানুপুলেট হবে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সেটা হতে দেওয়া উচিত না।
- অন্তর মাশঊদ