25/07/2026
চেম্বারের সোফায় বসে থাকা ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের তরুণীর দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। পাশে বসা স্বামী বেশ বিষণ্ণ মুখে ফাইলের পাতাগুলো উল্টাচ্ছিলেন। বিয়ের চার বছর পার হয়ে গেলেও সন্তান না হওয়ায় স্বজনদের কত না কথা শুনতে হয়েছে তাদের!
তরুণী কেঁদে ফেলে বললেন, "ম্যাডাম, প্রতি মাসে পিরিয়ডের সময় আমার পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হয়, ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারি না। অনেক ডাক্তার দেখালাম, পেইনকিলার খেলাম। শেষমেশ আল্ট্রাসাউন্ড করে বলা হলো আমার নাকি 'এন্ডোমেট্রিওসিস' হয়েছে, আর এই রোগের কারণে নাকি আমি কোনোদিন মা হতে পারব না! সত্যিই কি আমার সন্তান পাওয়ার সব আশা শেষ?"
আমি তরুণীর হাত দুটি ধরে আশ্বস্ত করে শান্ত গলায় বললাম, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আপনার মা হওয়ার স্বপ্ন মোটেও শেষ হয়ে যায়নি।" একজন গাইনোকোলজিস্ট ও অবস্টেট্রিশিয়ান (Gyne & Obs) হিসেবে প্রতিদিন এমন বহু নারীর মুখোমুখি হতে হয়, যারা এন্ডোমেট্রিওসিস নামটি শুনেই তীব্র আতঙ্কে ভেঙে পড়েন। অথচ সঠিক চিকিৎসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এই জট সহজেই খোলা সম্ভব।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যটি খুব স্পষ্ট, এন্ডোমেট্রিওসিস বন্ধ্যাত্বের একটি বড় কারণ, তবে সঠিক চিকিৎসায় গর্ভধারণ সম্ভব।
সহজ কথায়, জরায়ুর ভেতরের সুক্ষ্ম যে স্তরটিকে 'এন্ডোমেট্রিয়াম' বলা হয়, তা যদি কোনো কারণে জরায়ুর বাইরে, যেমন ডিম্বাশয় (O***y), ফেলোপিয়ান টিউব বা পেটের ভেতরের অন্যান্য অঙ্গের ওপর বেড়ে উঠতে শুরু করে, তাকেই এন্ডোমেট্রিওসিস বলে। পিরিয়ডের সময় জরায়ুর ভেতরের স্তরের মতোই এই জরায়ু-বহির্ভূত অঙ্গগুলোতেও রক্তক্ষরণ হয়। ফলে ডিম্বাশয়ে চকোলেট সিস্ট তৈরি হয়, জরায়ুর নালী বা ফেলোপিয়ান টিউব বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং তলপেটের ভেতরের টিস্যুগুলো একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে যায়। যা ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে বাধা দেয় এবং বন্ধ্যাত্ব ঘটায়।
তবে এর মানে এই নয় যে গর্ভধারণ অসম্ভব! আধুনিক স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে এই ক্ষতিকর টিস্যু ও সিস্টগুলো দূর করা যায়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোনাল থেরাপি, ওভুলেশন ইনডাকশন কিংবা অত্যাধুনিক প্রজনন প্রযুক্তি যেমন- আইইউআই (IUI) বা আইভিএফ (IVF)-এর মাধ্যমে সফলভাবে গর্ভধারণ সম্ভব।
তাই পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত বা অসহ্য তলপেটে ব্যথা, সহবাসে তীব্র কষ্ট কিংবা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান না হলে ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করবেন না। কালবিলম্ব না করে একজন অভিজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করুন।
মনে রাখবেন, এন্ডোমেট্রিওসিস মানেই মাতৃত্বের সমাপ্তি নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার হাত ধরে আপনার কোলেও ফুটে উঠতে পারে একটি ফুটফুটে নতুন প্রাণ।