11/10/2025
কেন জানি অতীতের কথা মনে পড়ছে।
এক অনুন্নত গ্রামে জন্ম,সাধারণ স্কুল শিক্ষকের ছেলে তবে গ্রামের অন্য বাচ্চাদের তুলনায় এমনকি ভাইবোনদের তুলনায় ভালভাবে বড় হয়েছি।পড়ালেখা শুরু স্থানীয় মাদ্রাসায়,বাড়িতে সন্ধ্যায় হারিকেন/বাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতাম,মা পড়াত। মা সম্ভবত ওই সময়ে সবচেয়ে মেধাবী ও বেশি ক্লাস (ক্লাস ৮ পাশ)পর্যন্ত লেখাপড়া জানা মহিলা ছিলেন।
আমরা ছোটবেলায় রুমাল বা স্যালাইন এর তার দিয়ে বই বেঁধে মাদ্রাসায় যেতাম। এবং গ্রামের প্রথম এমনকি মাদ্রাসার প্রথম স্কুল ব্যাগ বহনকারী ছাত্র ছিলাম।আব্বা চট্টগ্রাম /ঢাকা থেকে কিনে এনেছিল ক্লাস টু/থ্রীতে পড়ার সময়। ক্লাস ফাইভে ফাইনাল পরীক্ষায় পুরা মাদ্রাসায় ক্লাস টেন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে জীবনের প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলাম।
যাহোক ক্লাস ফাইভ পাশ করে মাদ্রাসায় তখন সাইন্স বিভাগ না থাকার জন্য হাইস্কুলে ভর্তি হলাম উপজেলার স্বনামধন্য চকময়রাম স্কুলে। ভর্তি পরীক্ষায় সব প্রাইমারী সিলেবাস থেকে প্রশ্ন হয়েছিল, আমার কাজিনের প্রাইমারী বই নানা বাড়ীতে গিয়ে পড়তাম বলে পরীক্ষায় অনেক কিছু কমন পড়েছিল। এভাবে স্কুল জীবন শুরু হল,উপজেলার অনেক মেধাবীরা পড়ত স্কুলে,ডাক্তার /ব্যাংকার/পুলিশ /নেতার সন্তান।
আমি অজ পাঁড়া গ্রামের যদিও শিক্ষকের ছেলে।ক্লাস বাই ক্লাসে পরিচিতির কাতারে আসতে শুরু করলাম। ক্লাস এইটে বৃত্তি পাওয়ার পর শিক্ষকদের কাছে কদর বাড়ল। এসএসসি তে তুলনামূলক ভাবে ভালো রেজাল্ট হলনা।
এসএসসির পর চলে গেলাম রাজশাহীতে ২০০২ সালে ভর্তি কোচিং করতে,এডমিশন টেস্ট দিয়ে নিউ গভ: ডিগ্রী তে ভর্তির সুযোগ পেলাম।যথারিতি এইচএসসি তে জিপিএ ৫ পেয়ে পাশ করে এসএসসির দুঃখ ঘুচল।
এরপর শুরু হল মেডিক্যাল কোচিং।
বাড়িতে এসে তখনও হারিকেনের আলোতে পড়তে হত।ভাগ্যক্রমে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেলাম,ভর্তি হলাম।
তখন থেকে গ্রামের এমনকি উপজেলার অনেক পরিচিত /আব্বার পরিচিত রা চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যালে গেলে তাদের সামান্যতম হেল্প করার সুযোগ পেতাম।
৫ বছর শেষে এমবিবিএস পাশ করলাম,যদিও চতুর্থ বর্ষে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়িতে এসে ছিলাম,গ্রামে কারেন্ট তখনও আসেনি,বোনের বাড়িতে গিয়ে পড়েছি।
এরপর প্রথম বিসিএস দিয়ে জীবনের প্রথমবারের মত অকৃতকার্য হলাম।
ইন্টার্নশিপ শেষে জীবনের প্রথম ঢাকা শহরে গেলাম। একদিকে বিসিএস প্রিপারেশন ও অন্য দিকে এফসিপিএস প্রিপারেশন সাথে পার্ট টাইম ক্লিনিকে সপ্তাহে ১/২ দিন জব।
বিসিএস ও এফসিপিএস দুটাতেই পাশ করলাম।
এফসিপিএস ট্রেনিং শুরু আর সাথে বিসিএস এ গেজেটেড হয়ে চাকরিতে যোগদান করার অপেক্ষা।
২০১৪ সালের ১০ জুলাই।
জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন। বিসিএস গেজেট হল,অথচ আমার নাম খুঁজে পেলাম না।
তখন পর্যন্ত জানতাম না যে চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরিতে জয়েন করার সুযোগ হয়না।
শুরু হল ক্যারিয়ার প্লানিং এর লাইনচ্যুত।
৬ মাস শুধু বাড়ি আর ঢাকা আসা যাওয়া করলাম,ট্রেনিং এ ঢুকলাম না।প্রশ্ন একটায় কেন আমার চাকরি হলনা,আমার উপজেলায় আমার থেকে পরের মেধাক্রমে যারা ছিল,তারা চাকরি করে।
সমাজের ও উপজেলার পরিচিত জনের তীর্যক সমালোচনা। বাড়ির সাথে দূরত্ব বেড়ে গেল।৬ মাস পর বিসিএস, এফসিপিএস এর আশা ছেড়ে গেলাম ফেনীতে ক্লিনিকে জব করতে।
সময়ের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিলাম।প্রায় ২ বছর পর সেই বিসিএস এ গেজেটেড হয়ে চাকরি হল। পোস্টিং হল পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির এক দূর্গম উপজেলায়।
আবার শুরু হল হতাশা।একবছর পর এফসিপিএস ট্রেনিং এ আসতে চাইলে ট্রান্সফার নিতে পারলাম না।
অবশেষে ডি কার্ড পরীক্ষা দিয়ে দিনাজপুরে চান্স পেলাম।
শুরু হল আর এক বিড়ম্বনা,নির্বাচনের জন্য ডেপুটেশন দিবে না।অনেক আন্দোলন এর পর ২ মাস পর ডেপুটেশন পেয়ে রাঙ্গামাটি ছেড়ে দিনাজপুরে আসলাম।
এতদিনে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।ভাঙ্গা লাইন ঠিক করে পুনরায় শুরু হল পড়ালেখা। কোর্স শেষে করোনা আসল,আবার অস্থিরতা। ৬ মাস পিছিয়ে ডি কার্ড ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাশ করে অনেকটা স্বস্তি পেলাম।
পাশ করার ২ বছর পর পেলাম অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে প্রমোশন।
প্রমোশন পাওয়ার পর থেকে শুধু মনে হয় কেন প্লানিং মত এগুতে পারলাম না।
আসলে প্লানিং করে ক্যারিয়ার সবার হয়না। আল্লাহ যেভাবে চাইছেন,সেভাব হয়েছে। লাইনচ্যুত হয়ে গেছিলাম কিছু মানুষের ষড়যন্ত্রে।
আজ তারা ফেরারী,ঘড় বাড়ি ছাড়া।
দিনশেষে এখন যখন সাপ্তাহিক চেম্বারে পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনের ও এলাকার মানুষের চিকিৎসার করার/ পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি তখন ভালই লাগে।
আলহামদুলিল্লাহ।
ডাঃ মো. মামুন রেজা।
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),
ডি-কার্ড,
এফসিপিএস -এফ পি (মেডিসিন)
কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি)।