02/11/2025
অটিজম: অসুখ না কি অসুখ নয়?
এক.
এই তর্কটা পশ্চিম দুনিয়ায় অনেক দিন ধরেই চলমান। এখন এই বিষয়টা প্রবেশ করেছে শিক্ষিত বাঙালি মহলেও, তবে ঠিক তর্ক হিসাবে নয়, কিছু ছুটা মন্তব্য হিসাবে। এবং তর্কের গোড়ার বিষয়গুলো এখানে অনুপস্থিত।
* * *
ঠিক অটিজম নিয়েই নয়, তবে এই তর্কের অনুরূপ কিছু তর্কের সূচনা ষাটের দশকে। তত অর্গানাইজড ফ্যাশনে না হলেও, একই ধাঁচের কিছু চিন্তা এন্টিসাইকিয়াট্রি নামে পরিচিত। থমাস স্যাজ এবং মিশেল ফুকো ছিলেন এই ধাঁচের চিন্তার মূল দুইজন ব্যক্তি। তাঁদের প্রতিপাদ্য কী ছিলো এবং সাইকিয়াট্রির ঠিক কী জাতীয় সমস্যার প্রেক্ষিতে এসব প্রতিপাদ্যের সূচনা, সেসব বেশ দীর্ঘ বিষয়। বর্তমান আলোচনার জন্য সেসব জানা থাকা ভালো, তবে আমার ধৈর্য ও সময়ের স্বল্পতা হেতু সেসব আলোচনায় না গিয়ে অটিজম নিয়ে তর্কটার মূল কিছু পয়েন্ট বলা যাক।
* * *
অটিজমে কিছু কি ডিসএবিলিটি হয়? ধরা যাক, আপনি বললেন, এখানে সত্যিকার ডিসএবিলিটি কিছু হয় না, হয় কিছু 'আপাত ডিসএবিলিটি'। এমনকি ধরা যাক, আপনি ডিসএবিলিটিও বলতে চান না, বলতে চান অটিজমে 'আপাত অসুবিধা' কিছু হয়। যাই বলেন না কেন, কিছু যে হয় এটা অন্তত আপনাকে স্বীকার করতে হবে। নচেৎ, অটিজম নিয়ে তর্কের উপস্থাপনই অর্থহীন।
এখন, কিছু যে অসুবিধা হয় এটার প্রকৃতি কেমন?
দুই.
ধরা যাক, একজন মানুষের স্ট্রোক হলো। স্ট্রোকের কারণে তার ডান হাত ও পায়ে প্যারালাইসিস। স্পষ্ট যে মানুষটা এখন অনেক কাজই করতে সক্ষম নয়। আপনি কি এই মানুষটাকে ডিসএবলড বলতে রাজি আছেন? তার এই ডিসএবিলিটির কারণ কী? কারণটা মানুষটার মধ্যেই অবস্থিত, তার ব্রেইনের কিছু ড্যামেজ। এই যে ডিসএবিলিটি, যার কারণ মানুষটার মধ্যেই অবস্থিত হিসাবে আমরা ব্যাখ্যা করলাম, ব্যাখ্যার এই ধরনের নাম ডিসএবিলিটির মেডিকেল মডেল।
এবার ধরা যাক, বাংলা সাহিত্যের একজন শিক্ষকের কথা, যিনি তাঁর পেশায় খুবই সক্ষম। কিন্তু কোনো কারণে তিনি সাইবেরিয়ার একটা অঞ্চলে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হলেন, যেখানকার ভাষা তিনি জানেন না। এখন তিনি কি সেখানে আর শিক্ষকতা করতে পারবেন? আপনি কি এখন তাঁকে ডিসএবলড বলতে রাজি আছেন? যদি রাজি থাকেন, তাঁর এই ডিসএবিলিটির কারণ কী? কারণ তাঁর মধ্যে অবস্থিত নয়, অবস্থিত তিনি যে সমাজে এখন বাস করছেন সেই সমাজের মধ্যে। এই যে ডিসএবিলিটি, যার কারণ সমাজের মধ্যে অবস্থিত হিসাবে আমরা ব্যাখ্যা করলাম, ব্যাখ্যার এই ধরনের নাম ডিসএবিলিটির সামাজিক মডেল।
তিন.
অটিজমে যে ডিসএবিলিটি, বা ধরেন অসুবিধা, হয় তা কোন্ মডেল দিয়ে ব্যাখ্যাযোগ্য? যদি মেডিকেল মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারেন তাহলে এটাকে অসুখ বলা যেতে পারে, আর যদি সামাজিক মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারেন তাহলে এটা অসুখ নয়। আরগুমেন্টের মূল রূপটা মোটামুটি এই।
মেডিকেল মডেলটা বিবেচনা করা যাক। আমরা এখনও ঠিক জানি না অটিজম ব্রেইন বা মনের ঠিক কী সমস্যার কারণে হয়। খুব সম্ভব, আমরা যদি অ্যাগজাক্ট কারণটা খুঁজে পাই, তখন নিঃসন্দেহে বলতে পারব যে অটিজম একটা অসুখ? না, তত সোজা আসলে নয়।
ধরা যাক, আমরা খুঁজে পেলাম apw নামক জিনের একটা পরিবর্তন বা এই নামের একটা মলিকুলের কারণে অটিজম হয়। আমরা কি এখন বলতে পারব অটিজম একটা অসুখ? ভেবে দেখেন, শরীরের সব জিন বা মলিকুল একইরকমের জিন বা মলিকুল, কোনোটার গায়ে লেখা নেই সে অসুস্থ। আমরা একটা জিন বা মলিকুলকে অসুস্থ বলি শুধু তখনই, যখন আমরা মানুষটার বাইরের অসুবিধাকে অসুখ বলতে রাজি থাকি।
ব্যাপারটা ক্লিয়ার করার জন্য অন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক, বাঙালি একটা মেয়ে যার গায়ের রঙ কালো। এখন কালো রঙের জন্য দায়ী শরীরের কিছু মলিকুল ও জিন, এবং আমাদের সমাজে কালো রঙ কিছু অসুবিধাও তৈরি করে। সুতরাং কালো রঙ একটা অসুখ? খুব সম্ভব আপনি এখন যুক্তি দেখাবেন যে, এই অসুবিধা সমাজকর্তৃক আরোপিত, কাজেই অসুখ নয়, মলিকুল বা জিন চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও।
একই আরগুমেন্ট অটিজমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আপনি বলতে পারেন অটিজমের অসুবিধাও সমাজকর্তৃক আরোপিত, সুতরাং এটা অসুখ নয়, apw নামক জিন বা মলিকুল চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও।
সাধারণ মানুষ এবং ডাক্তারদের মধ্যে যাঁরা মেডিকেল সাইন্সের ফিলোসফি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, তাঁদের মধ্যে একটা সরল ধারণা প্রচলিত আছে যে, কোনোকিছুকে অসুখ বলা যাবে কি না তা ক্লিয়ার হবে ব্যক্তির মধ্যে শারীরিক বা মানসিক কারণ অ্যাগজাক্টলি চিহ্নিত করা সম্ভব হলেই। এই ধারণা খুব সম্ভব ঠিক নয়। অ্যাগজাক্ট কারণ চিহ্নিত করার উপরে কোনোকিছুকে অসুখ বলা বা না বলা তেমন নির্ভর করে না।
তাহলে কারণ চিহ্নিত করার গুরুত্ব কী? গুরুত্ব হলো চিকিৎসা উদ্ভাবনের এবং একটা অসুখ থেকে আরেকটা অসুখ আলাদা করার ক্ষেত্রে। কিন্তু সমস্যা যদি হয় আরও গোড়ার প্রশ্ন, অসুখ বলা হবে কি না, তাহলে অ্যাগজাক্ট কারণের আবিষ্কার খুব হেল্পফুল নয়। মানসিক অসুবিধার ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি প্রযোজ্য।
এবার ধরা যাক, অটিজমের কারণ হলো apw নামক জিন বা মলিকুল, এবং আমরা একটা ওষুধও আবিষ্কার করতে পেরেছি যা খেলে অটিজম ঠিক হয়ে যায়। এখন কি অটিজমকে অসুখ বলা যাবে? খুব সম্ভব এখনও যাবে না। একটা উদাহরণ কল্পনা করা যাক।
একজন মহিলার ব্রেস্ট তেমন উঁচু নয়। তিনি মনে করছেন যে তাঁর জন্য এটা অসুবিধার (ধরে নিন অসুবিধার বোধটা সমাজকর্তৃক আরোপিত)। তিনি সার্জারির মাধ্যমে ব্রেস্ট বড় করলেন। আপনি কি বলবেন, চিকিৎসা সম্ভব হলো বলেই ছোট ব্রেস্ট থাকা একটা অসুখ? খুব সম্ভব বলবেন না।
এভাবে আপনি যতক্ষণ অটিজমের অসুবিধাকে সমাজ-আরোপিত হওয়া সম্ভব মনে করবেন ততক্ষণ মেডিকেল মডেলের ফাঁক বের করা সম্ভব।
চার.
এই যে আমরা কারণ আবিষ্কার হওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত, কল্পিত যদিও, অটিজমের অসুবিধার মেডিকেল মডেলকে উপেক্ষা করতে সক্ষম হলাম, কীসের জন্য? কারণ আমরা ধরে নিয়েছি অটিজমের অসুবিধা আসলে সমাজকর্তৃক আরোপিত। কিন্তু অটিজমের সামাজিক মডেল কি সত্যিই এতটা ভায়াবল যে এর জন্য মেডিকেল মডেলকে এতদূর পর্যন্ত উপেক্ষা করা যাবে? আপনিই সিদ্ধান্ত নিন, আমি শুধু সামাজিক মডেলটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
* * *
নব্বইয়ের দশকে নিউরোডাইভারসিটি নামক একটা সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয় (বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারভিত্তিক আন্দোলন নয় কিন্তু)। এর প্রপোনেন্টদের বক্তব্য, কালচারাল ডাইভারসিটির মতোই নিউরোডাইভারসিটিও একটা স্বাভাবিক ঘটনা। যাদেরকে আমরা নিউরোটিপিক্যাল (অন্য কথায় নরম্যাল) মানুষ মনে করি, তাদের মতোই অটিজমওলা মানুষরাও স্বাভাবিক। এবং তারা অন্যান্য মাইনরিটি গ্রুপের মতোই একটা মাইনরিটি গ্রুপ। অন্যান্য মাইনরিটি গ্রুপ যেমন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইকুইটেবল এক্সেস থেকে বঞ্চিত, অটিজমওলা মানুষরাও একইভাবে বঞ্চিত। অটিজম নিজে থেকে অসুবিধাজনক নয়, অসুবিধা এখানে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সৃষ্ট। সামাজিক ও পলিসি লেভেলে পরিবর্তন আনলেই অটিজমের অসুবিধা আর থাকবে না, তারাও হবে এবলড, হয়ত আলাদাভাবে (ডিফারেন্টলি) এবলড। এখানে অটিজম কোনো অসুখ নয়, বরং অটিজম ব্যক্তির আইডেনটিটি, যেমন ইথনিসিটি একটা আইডেনটিটি।
অনেকেই হয়ত একমত হবেন যে, অটিজমের অসুবিধা যদি অল্প বা মাঝারি হয় তাহলে এই মডেল বেশ ভায়াবল। অন্তত সামাজিক ও পলিসি লেভেলে পরিবর্তন আনলে অনেককেই ভালো রাখা সম্ভব।
যেরকমই হোক না কেন, এই নিউরোডাইভারসিটি আন্দোলন পশ্চিমে বেশ পপুলার। তবে সাইকিয়াট্রিস্ট মহলে এই মডেল নিয়ে একাডেমিক্যালি তত উৎসাহ এখনও আসলে নেই।
পাঁচ.
শুরুর প্রশ্নে ফেরা যাক। অটিজম অসুখ না কি অসুখ নয়? আমি আসলে কোনো সিদ্ধান্ত দেব না, অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসলে দরকার নেই। যেরকমই ভাবি না কেন, অটিজম নিয়ে যারা আছে তারা ভালো থাকুক, সেটা যেদিক থেকেই ভালো রাখা সম্ভব হয়।
যদি কোনোদিন ফলপ্রসূ চিকিৎসা বের হয়, মানুষ তখন শুধু সাইকিয়াট্রিস্টদের কাছেই যাবে, মেনে নেবে যে অটিজম একটা অসুখ। যদি কোনোদিন পলিসি মেকাররা এবং সমাজ সফল হয় অটিজমওলা মানুষদের ভালো রাখতে, মানুষ মেনে নেবে যে অটিজম আসলেই একটা স্বাভাবিক ডাইভারসিটি।
ততদিন আমরা কেবল অপেক্ষা করতে পারি।
(নোট: এটা বেশ আশ্চর্য যে, NHS-এর ওয়েবসাইটে অটিজম সম্পর্কে সরাসরি বলা হয়েছে, এটা কোনো অসুখ নয়। সত্য হচ্ছে, সাইকিয়াট্রির একাডেমিয়াতে এটা এখনও অসুখ হিসাবেই পরিগণিত। তাহলে NHS-এর ওয়েবসাইটে এটা বলা হলো কেন? খুব সম্ভব তাদের পলিসিমেকার লেভেলে নন-সাইকিয়াট্রিস্ট এমন কেউ আছেন যিনি নিউরোডাইভারসিটির প্রপোনেন্ট।)