13/07/2026
পাশের বাড়ির রোগীর সাথে তুলনা বন্ধ করুন, চিকিৎসকের কথা শুনুন!
ক্যান্সার চিকিৎসায় আমাদের প্রতিদিন এমন অসংখ্য রোগীর মুখোমুখি হতে হয়, যারা নিজের রোগকে পাশের বাড়ির কোনো রোগীর লক্ষণের সাথে তুলনা করে জীবনের চরম ঝুঁকি ডেকে আনেন।
এমন কয়েকটি বাস্তব ও নির্মম ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি:
🛑 ঘটনা ১: অবহেলা ও ভুল চিকিৎসা
এক নারী রোগীর ব্রেস্টে টিউমার হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ ১ বছর ধরে হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেয়েছেন। কারণ? পাশের বাসার এক নারীর নাকি এমন টিউমার ছিল এবং তিনি হোমিওপ্যাথি খেয়ে ভালো হয়েছেন।
বাস্তবতা: ব্রেস্ট টিউমার সাধারণত দুই রকমের হয়—
বেনাইন বা ভালো টিউমার: যেমন ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা বা ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ। এগুলোতে চিকিৎসা না করলেও রোগী দীর্ঘদিন স্বাভাবিক থাকতে পারেন। সম্ভবত পাশের বাসার রোগীর সেটিই ছিল।
ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বা ক্যান্সার : এই রোগীর ক্ষেত্রে টিউমারটি আসলে ক্যান্সার ছিল। ভুল ধারণার পেছনে ছুটে আজ ২ বছর পর ক্যান্সারটি তার লিভার ও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছে। স্তনের টিউমারটি বিশাল আকার ধারণ করে সেখান থেকে পুঁজ পড়ছে।
🛑 ঘটনা ২: অপারেশন না করা
দ্বিতীয় এক রোগী কেমোথেরাপি নেওয়ার পর তার টিউমারটি ছোট হয়ে আসে। এরপর তাকে অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হলে তিনি তা করেননি। তার যুক্তি—পাশের বাসার অমুক রোগীর তো অপারেশন লাগেনি, সে তো ভালো আছে!
বাস্তবতা: ক্যান্সার যদি একদম শেষ পর্যায়ে (Last Stage) থাকে, তখন অনেক সময় আমরা অপারেশন করি না। পাশের বাসার রোগীর হয়তো সেই অবস্থা ছিল। কিন্তু এই রোগীর ক্যান্সার ছিল আর্লি স্টেজে (Early Stage), যেখানে অপারেশন করাটা বাধ্যতামূলক ছিল। ফলাফল? ৬ মাস পর তিনি স্তনে বিশাল আকারের টিউমার এবং পুঁজ পড়ার সমস্যা নিয়ে আবার ফিরে এসেছেন।
🛑 ঘটনা ৩: রেডিওথেরাপি না দেওয়া
তৃতীয় এক রোগী কেমোথেরাপি শেষ করার পর আর রেডিওথেরাপি নেননি। কারণ, পাশের বাসার রোগীর নাকি রেডিওথেরাপি লাগেনি।
বাস্তবতা: আর্লি স্টেজের কিছু ক্যান্সারে অপারেশনের পর শুধু কেমোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে, রেডিওথেরাপি নাও লাগতে পারে। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি ছিল। চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনে বসে থাকার মাত্র ৬ মাসের মাথায় অপারেশনের জায়গায় ক্যান্সার আবার ফিরে এসেছে।
🛑 ঘটনা ৪: সাইকেল সংখ্যা নিয়ে অযথা আতঙ্ক
অনেকের ধারণা, পাশের বাসার রোগীকে ৮টা কেমোথেরাপির সাইকেল দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাকে কেন ১৭টা দেওয়া হলো? রোগী ভাবছেন তার ক্যান্সার হয়তো আর সারবেই না!
বাস্তবতা: সাধারণত কেমোথেরাপি ৮টি সাইকেল দেওয়া হলেও, কোনো রোগীর যদি HER2 (হার্ট-টু) পজিটিভ ডিজিজ থাকে, তবে তাকে টোপোগ্রাফিক/টার্গেটেড থেরাপি (Trastuzumab) ১৭টি সাইকেল পর্যন্ত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এটি ক্যান্সার পুরোপুরি নির্মূল করার জন্যই দেওয়া হয়, ভয়ের কিছু নেই।
মনে রাখুন: ক্যান্সারের চিকিৎসা সবার জন্য এক নয়!
ক্যান্সারের চিকিৎসা কখনো পাশের বাসার রোগীর প্রেসক্রিপশন দেখে বা তুলনা করে হয় না। ব্রেস্ট ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর:
ক্যান্সারের স্টেজ (Stage) এবং গ্রেড (Grade)
রোগীর বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতা
ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি (IHC) রিপোর্ট—যেমন ER, PR এবং HER2 স্ট্যাটাস।
ক্যান্সারের চিকিৎসায় অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং হরমোন থেরাপি রয়েছে। কার কোন থেরাপি লাগবে, কয়টি সাইকেল লাগবে এবং কোনটি আগে বা পরে লাগবে—এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ (Oncologist) রোগীর রিপোর্ট পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করতে পারেন।
সতর্কবার্তা:
পাশের বাসার রোগীর সাথে তুলনা করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনবেন না। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা চিকিৎসা বন্ধ করা বন্ধ করুন। যেকোনো সমস্যা বা জিজ্ঞাসায় সরাসরি আপনার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন
ডাঃ মনি রানী
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
রেডিওথেরাপি বিভাগ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রংপুর
চেম্বার রংপুর স্পেশালাইজড হাসপাতাল