25/08/2026
ডেঙ্গু হলে রোগী ও পরিবারের অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন আসে। নিচের বিষয়গুলো জানা থাকলে অযথা ভয় না পেয়ে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
১| ডেঙ্গু রোগী কি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে ?
হ্যাঁ, অবশ্যই। ডেঙ্গু আক্রান্ত মা সাধারণত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করে মায়ের নিজের শরীরের পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করাও জরুরি।
২| ডেঙ্গু রোগীকে কতদিন মশারির ভেতর থাকতে হবে?
জ্বর শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন রোগীর রক্তে ভাইরাস থাকার সম্ভাবনা বেশি। জ্বর থাকাকালীন রোগীর শরীর সংক্রমিত থাকে এবং এসময় মশা কামড় দিলে সেই সংক্রমিত মশা দিয়ে অন্যদের ডেঙু হবার সমভাবনা থাকে। এ সময় রোগীকে মশার কামড় থেকে কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে। মশারি, রিপেলেন্ট, ফুলহাতা পোশাক ও ঘরের মশা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
৩| ডেঙ্গু হলে সবসময় কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়?
না। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে পর্যবেক্ষণে থাকতে পারেন। তবে অতিরিক্ত বমি, প্রচণ্ড পেটব্যথা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ঘুমঘুম ভাব বা প্রস্রাব কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
৪| ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কত হলে বিপদ?
শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর অবস্থা বিচার করা যায় না। রোগীর রক্তচাপ, হেমাটোক্রিট, রক্তপাত, প্রস্রাবের পরিমাণ, শারীরিক অবস্থা এবং প্লেটলেটের ওঠানামা সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। তাই শুধু প্লেটলেট কমেছে বলে আতঙ্কিত হওয়া ঠিক নয়।
৫| প্লাটিলেট কমলেই কি প্লটিলেট দিতে হবে?
না। রুটিনভাবে শুধু কম প্লাটিলেটের কারণে প্লাটিলেট দেওয়া হয় না। সক্রিয়/গুরুতর রক্তপাত, অত্যন্ত কম প্লেটলেটসহ বিশেষ পরিস্থিতি বা চিকিৎসকের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে রক্তের উপাদান দেওয়া হতে পারে।
৬| ডেঙ্গুতে জ্বর কমে গেলে কি রোগী সুস্থ হয়ে গেছে?
সবসময় নয়। বরং জ্বর কমার সময় থেকেই ডেঙ্গুর critical phase শুরু হতে পারে। সাধারণত জ্বর কমার পরের ২৪–৪৮ ঘণ্টা বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়। এ সময় সতর্কতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
৭| ডেঙ্গুতে কোন জ্বরের ওষুধ নিরাপদ?
জ্বর ও ব্যথার জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। Aspirin, ibuprofen, naproxen বা অন্যান্য NSAID নিজে থেকে খাওয়া উচিত নয়, কারণ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৮| ডেঙ্গুতে পানি কতটুকু খেতে হবে?
একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। রোগীর বয়স, ওজন, জ্বর, বমি, প্রস্রাব এবং অন্যান্য রোগের ওপর তরলের প্রয়োজন নির্ভর করে। পানি, ওরস্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি ও অন্যান্য সহনীয় তরল খাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত পানি জোর করে খাওয়ানোও ঠিক নয়।
৯| ডেঙ্গুতে ডাবের পানি বা পেঁপে পাতার রস কি প্লেটলেট বাড়ায়?
ডাবের পানি তরল ও ইলেকট্রোলাইটের উৎস হিসেবে উপকারী হতে পারে, কিন্তু এটি ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট চিকিৎসা নয়। পেঁপে পাতার রস প্লেটলেট বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিরাময় করে, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই এগুলোকে চিকিৎসার বিকল্প মনে করা যাবে না।
১০| ডেঙ্গুতে গোসল করা যাবে?
হ্যাঁ। স্বাভাবিক বা কুসুম গরম পানিতে গোসল করা যায়। খুব ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা না করাই ভালো। জ্বর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
১১| ডেঙ্গুতে কী কী খাবার খাওয়া উচিত?
সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। যেমন ভাত, খিচুড়ি, ডাল, মাছ, ডিম, সবজি, ফল, স্যুপ ও অন্যান্য সহনীয় খাবার। রোগীর ক্ষুধা কম থাকলে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানো যেতে পারে।
১২| ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক লাগে কি?
সাধারণ ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ডেঙ্গু ভালো হয় না। ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রমাণ বা চিকিৎসকের নির্দিষ্ট কারণ থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
১৩| ডেঙ্গুতে CBC কতদিন পরপর করতে হবে?
সবার জন্য একই নিয়ম নেই। জ্বরের দিন, রোগীর উপসর্গ, প্লেটলেট, হেমাটোক্রিট এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে CBC করার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে critical phase-এ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
১৪| ডেঙ্গু রোগীর কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত?
নিচের যেকোনো একটি থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
• তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা
• বারবার বমি
• নাক/মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া বা অন্য রক্তপাত
• রক্তবমি বা কালো পায়খানা
• অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাব
• শ্বাসকষ্ট
• প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
• হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
• মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা
১৫| ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হওয়ার পর কি আবার ডেঙ্গু হতে পারে?
হ্যাঁ। ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক serotype রয়েছে। এক ধরনের ডেঙ্গু হওয়ার পর অন্য serotype দ্বারা ভবিষ্যতে আবার সংক্রমণ হতে পারে। তাই একবার ডেঙ্গু হয়ে গেলেও মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা জরুরি।
ডেঙ্গুতে শুধু প্লাটিলেট নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, রক্তপাত, হেমাটোক্রিট, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তচাপ ও warning signs পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সম্পূর্ণ সুস্থতার লক্ষণ মনে করবেন না।
#ডেঙ্গু #ডেঙ্গুজ্বর #ডেঙ্গুসচেতনতা #ডেঙ্গুচিকিৎসা #প্লেটলেট #মশারিকামড় #স্বাস্থ্যসচেতনতা #স্বাস্থ্যতথ্য