26/09/2026
ম্যাডাম, নরমাল ডেলিভারি ভালো নাকি সিজার?
এই প্রশ্নটা প্রায় প্রতিদিনই শুনি।
অনেক মা মনে করেন, নরমাল হলে ভালো মা, আর সিজার হলে বুঝি কোথাও একটা ব্যর্থতা ! আবার কেউ কেউ ভাবেন, সিজার করলে কষ্ট কম, ঝামেলাও কম।
আসলে দুটো ধারণার কোনোটাই পুরোপুরি ঠিক নয়।
একজন মায়ের জন্য কোনটা ভালো, সেটা নির্ভর করে সেই নির্দিষ্ট সময়ে মা আর বাচ্চার অবস্থা কেমন, গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা আছে কি না এবং প্রসব কীভাবে এগোচ্ছে তার ওপর।
সোজা কথায় বললে,
যেখানে নিরাপদভাবে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব, সেখানে অপ্রয়োজনে সিজার করার দরকার নেই।
আবার,
যেখানে নরমাল ডেলিভারি মা বা বাচ্চার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে শুধু “নরমাল করতেই হবে” এই জেদ করাও ঠিক নয়।
তাহলে একটু খোলাসা করে বলি।
নরমাল ডেলিভারি হলে কী সুবিধা?
মা যদি সুস্থ থাকেন, বাচ্চার অবস্থা ভালো থাকে এবং প্রসব স্বাভাবিকভাবে এগোয়, তাহলে স্বাভাবিক প্রসবের বেশ কিছু সুবিধা আছে।
মা সাধারণত তুলনামূলক দ্রুত চলাফেরা করতে পারেন, হাসপাতালে থাকার সময় কম হতে পারে এবং অস্ত্রোপচারের ক্ষত বা অপারেশন-পরবর্তী জটিলতা থাকে না।
তবে নরমাল ডেলিভারি মানেই যে একদম কোনো কষ্ট থাকবে না, তা নয়।
প্রসবের ব্যথা থাকবে।কখনো যোনিপথে ছিঁড়ে যাওয়া বা সেলাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কখনো প্রসব দীর্ঘ হতে পারে। আবার প্রয়োজন হলে প্রসব সহায়তায় অন্য পদ্ধতিও লাগতে পারে।
অর্থাৎ নরমাল ডেলিভারি হলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত প্রক্রিয়া নয়।
এবার আসি সিজারে।
সিজার কোনো “সহজ রাস্তা” নয়। এটা একটি বড় অস্ত্রোপচার। তবে এই অস্ত্রোপচারই অনেক সময় মা এবং বাচ্চার জীবন রক্ষা করে। যেমন বাচ্চার অবস্থান এমন হলে যে নরমাল ডেলিভারি নিরাপদ নয়, প্লাসেন্টার কিছু জটিলতায়, প্রসব এগোতে না চাইলে, বাচ্চার হার্টবিটে গুরুতর সমস্যা দেখা দিলে, অথবা মায়ের এমন কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে যেখানে নরমাল ডেলিভারি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এসব পরিস্থিতিতে সিজার করা মানে “নরমাল ডেলিভারি ব্যর্থ হয়েছে” না।
বরং তখন সিজারই নিরাপদ চিকিৎসা।
আর একটা কথা খুব মনে রাখবেন। সিজারিয়ান মানেই কষ্ট নেই, এটাও ভুল ধারণা।
অপারেশনের পর ব্যথা, চলাফেরায় অসুবিধা, ক্ষতের যত্ন, সংক্রমণসহ কিছু ঝুঁকি থাকে এবং ভবিষ্যতের গর্ভাবস্থাতেও আগের সিজারের কিছু প্রভাব থাকতে পারে।
তাই শুধু ব্যথা এড়ানোর জন্য বা “ অমুকের সিজার হয়েছে, আমারও হবে” ভেবে সিজার বেছে নেওয়া ঠিক নয়।
আবার,
“একবার সিজার হয়েছে, পরেরবার কোনোভাবেই নরমাল হবে না”
এটাও সবার ক্ষেত্রে সত্যি নয়।
আগের সিজারের কারণ, জরায়ুর আগের কাটার ধরন, বর্তমান গর্ভাবস্থার অবস্থা এবং আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করে উপযুক্ত মায়ের ক্ষেত্রে পরবর্তীবার নরমাল প্রসবের চেষ্টা করা যেতে পারে।
তবে এটাও সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। সিদ্ধান্তটা ব্যক্তিভেদে নিতে হয়।
আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়…
শুধু “নরমাল ডেলিভারি চাই” বললেই হবে না।
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ করতে হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে হবে, বাচ্চার বৃদ্ধি ও অবস্থান দেখতে হবে এবং প্রসবের সময় মা ও বাচ্চার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
কারণ প্রসবের সিদ্ধান্ত অনেক সময় শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করতে পারে।
তাই আমার কাছে “নরমাল না সিজার?” প্রশ্নটার উত্তর হলো,
যে পদ্ধতিতে মা ও বাচ্চার জন্য নিরাপদভাবে প্রসব করানো সম্ভব, সেই পদ্ধতিই ওই মায়ের জন্য সঠিক পদ্ধতি।
অপ্রয়োজনীয় সিজার যেমন কাম্য নয়, তেমনি প্রয়োজনের সময় সিজার না করিয়ে শুধু নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করাও নিরাপদ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সিজারকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের ওপর জোর দেয়, কোনো নির্দিষ্ট হারে সিজার করানোর লক্ষ্য নির্ধারণকে সমর্থন করে না।
আর সবচেয়ে জরুরি কথা…
সিজার হয়েছে বলে কোনো মা কম কষ্টে মা হয়েচে এমন নন।
একজন মা কতটা ভালো মা, সেটা তার পেটের ওপর দাগ দেখে মাপা যায় না।
তিনি ১২ ঘণ্টা প্রসব বেদনা সহ্য করে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, নাকি অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, সেটা দিয়ে মাতৃত্বের মূল্য ঠিক হয় না।
শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই তো একই জিনিস চাই…
মা সুস্থ থাকুক, বাচ্চা সুস্থ থাকুক, আর দুজনেই নিরাপদে বাড়ি ফিরুক।
তাই পাশের বাসার আন্টি কী বললেন, ফেসবুকের কোন পোস্টে কী লেখা আছে, কিংবা অন্য কার কীভাবে ডেলিভারি হয়েছে…
এসব দিয়ে নিজের ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নেবেন না।
আপনার গর্ভাবস্থা আপনার। আপনার মা হওয়ার গল্পটাও আপনার নিজের।
তাই আপনার সিদ্ধান্তটা হোক মা ও বাচ্চার চিকিৎসাগত অবস্থার ভিত্তিতে, ভয় বা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে নয়………😊।
~ ডা.ফাহমিদা মাহবুবা বন্যা ~