07/04/2026
কেন হামের টিকা ৯ মাস বয়সেই দেওয়া হয়? ৬ মাসে কেন নয়?
হাম (Measles) শিশুদের জন্য একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। সম্প্রতি আমাদের দেশে অনেক শিশু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই (যেমন- ৬ মাসে) হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যা নিয়ে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠেছে— তাহলে টিকা কেন আরও আগে দেওয়া হচ্ছে না?
এর পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ও রোগতত্ত্বীয় (Scientific & Epidemiological) কারণ রয়েছে। নিচে তার প্রধান যুক্তিগুলো তুলে ধরা হলো:
১. মায়ের থেকে পাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (Maternal Antibodies)
প্রকৃতিগতভাবেই নবজাতক তার মায়ের শরীর থেকে (প্লাসেন্টার মাধ্যমে) হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকারী অ্যান্টিবডি নিয়ে জন্মায়। একে বলা হয় 'প্যাসিভ ইমিউনিটি'।
* সমস্যা: হামের টিকা হলো একটি 'লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড' বা দুর্বল করা জ্যান্ত ভাইরাস। শিশুর শরীরে যদি মায়ের দেওয়া অ্যান্টিবডি বেশি থাকে, তবে সেই অ্যান্টিবডি টিকার ভাইরাসটিকে শরীর নিজের ইমিউন সিস্টেম চেনার আগেই ধ্বংস করে দেয়।
* ফলাফল: ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে সেটি মায়ের অ্যান্টিবডির কারণে কার্যকর হয় না। শিশু টিকা পেল ঠিকই, কিন্তু তার শরীর নিজের থেকে কোনো স্থায়ী সুরক্ষা তৈরি করতে পারলো না। একে বিজ্ঞানের ভাষায় 'Primary Vaccine Failure' বলা হয়।
২. ইমিউন সিস্টেমের পরিপক্কতা (Immunological Maturity)
শিশুর নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সময়ের সাথে সাথে শক্তিশালী হয়।
* গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে মাত্র ৫০-৭০% শিশুর শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হয়।
* অন্যদিকে, ৯ মাস বয়সে দিলে প্রায় ৮৫-৯০% শিশুর শরীর সফলভাবে সাড়া দেয়।
* ১৫ মাস বয়সে (দ্বিতীয় ডোজ) দিলে তা প্রায় ৯৫-৯৯% এ পৌঁছায়।
তাই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতেই ৯ মাস সময়টিকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়েছে।
৩. কেন ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ (MR-2)?
প্রথম ডোজ দেওয়ার পরও প্রায় ১০-১৫% শিশুর শরীরে হয়তো পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। এই 'বাকি থাকা' শিশুদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। এটি 'হার্ড ইমিউনিটি' (Community Immunity) তৈরির জন্য অপরিহার্য।
৪. আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও WHO কী বলে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিয়ম অনুযায়ী:
* যেসব দেশে হামের ঝুঁকি বেশি (যেমন- বাংলাদেশ), সেখানে প্রথম ডোজ ৯ মাসে দেওয়া হয়।
* যেসব দেশে ঝুঁকি কম, সেখানে সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ১২-১৫ মাসে।
তাহলে ৬ মাস বয়সী শিশুদের সুরক্ষার উপায় কী?
যদি কোনো এলাকায় বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব (Outbreak) দেখা দেয়, তবে বিশেষ ব্যবস্থায় ৬ মাস বয়সে একটি 'জিরো ডোজ' (Zero Dose) দেওয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে:
> ৬ মাসে দেওয়া টিকাটি হবে একটি অতিরিক্ত ডোজ। এই শিশুকে অবশ্যই পুনরায় ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে নিয়মিত ইপিআই (EPI) শিডিউল অনুযায়ী টিকা দিতে হবে। নতুবা সে ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখেই থেকে যাবে।
>
আখতার হোসেন ভাই যে উদ্বেগের কথা বলেছেন তা যৌক্তিক, তবে টিকাদানের বয়স কমানো সমাধান নয়। বরং মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করা (যাতে শিশু বেশি অ্যান্টিবডি পায়) এবং ৯ মাস ও ১৫ মাসের টিকা যাতে একটি শিশুও বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করাই বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রটোকল অনুযায়ী সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।