27/01/2020
যকৃৎ প্রদাহ বা হেপাটাইটিস
কোন কারণে যকৃতের তরুণ প্রদাহ এবং সেজন্য ক্রিয়াগত কোন বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তাকে যকৃৎ প্রদাহ বলে । Dr . P. C. Das বলেন – “ It is a disease characterized by anorexia, fever, jaundice and hapatomegaly caused by virus ” এই রোগে আক্রান্ত হলে যকৃৎ তার নিজস্ব ক্রিয়া শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং নানাবিধ রোগ উপসর্গ দেখা দেয় ।
কারণ
ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, কালাজ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্লেগ, সিফিলিস ইত্যাদি রোগের সংক্রমণ ।
বিকোলাই, যকৃতের অ্যামোবায়োসিস প্রভৃতি রোগ ।
পিত্ত নালীতে অবরুদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি । পিত্ত পাথুরী, জীবাণু সংক্রমণ, পিত্তনালীর সংকোচন । পিত্তনালী, যকৃৎ, পাকস্থলী বা কিডনীতে অর্বুদ সৃষ্টি । ইহাকে অবরোধ জনিত যকৃৎ প্রদাহ Obstructive Hepatitis বলে ।
সুরাপান, ক্লোরোফর্ম, কার্বনটেট্রাক্লোরাইড, আর্সেনিক, স্যাণ্টুনাইন প্রভৃতির বিষক্রিয়া এবং কতিপয় ঔষধের প্রতিক্রিয়াজনিত কারণ ।
লিভারের সিরোসিস । এছাড়া ভাইরাস সংক্রান্ত যকৃৎ প্রদাহ সাধারণত তিনটি কারণে হতে পারে যথা – 1. Virua A . 2. Virus B . 3. Virus A এবং B বহির্ভূত ।
Virua A: এই জাতীয় ভাইরাস রোগীর মলে পাওয়া যায় । ইহারা প্রধানত খাদ্য ও পানীয় মাধ্যমে অন্ননালীর সাহায্যে শরীরে সংক্রমিত হয় ।
Virus B: এই জাতীয় ভাইরাস রোগীর রক্তে পাওয়া যায় এবং ইহারা Hepatitis Associated Antigen – HAA নামে অভিহিত ।
Virus A এবং B বহির্ভূত: এই জাতীয় ভাইরাস সাধারণত জলের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় । মাঝে মাঝে কোন বিশেষ অঞ্চলে এই জাতীয় ভাইরাস রোগ বিস্তার করে।
জণ্ডিস উপসর্গ ( Complication ):
যকৃৎ প্রদাহ যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় তবে নানাবিধ জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে যেমন লিভার ফোঁড়া ( Liver Abcess ) হতে পারে । অনেক সময় লিভার ধীরে ধীরে ছিবড়ার মত হয়ে যায়, উহাকে বলে Cirrhosis of liver । অনেক সময় Liver Cancer হতে পারে ।
রোগ নির্ণয় ( Diagnosis ):
পিত্ত বমি, লিভার ব্যথা, বামস্কন্ধে ব্যথা, বুকে ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখে এই রোগ নির্ণয় করা যায় । এছাড়া X-Ray করলে লিভারের স্বাভাবিক ভাবটি ধরা পড়ে । Ultra sonography of liver, gall biadder, pancreas প্রয়োজন ।
পথ্য ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা ( Diet and Management ):
যেহেতু লিভার মানবদেহের পরিপাক, রক্ত শোধন, খাদ্য সঞ্চয় প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করতে বিশেষভাবে সহায়তা করে সেজন্য এই যন্ত্রটি যাতে সুস্থ থাকে এবং সবল থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিৎ । লিভারের পক্ষে ক্ষতিকর অথবা লিভারের কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এমন কোন কাজ করা উচিৎ নয় । ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, বিকোলাই প্রভৃতি রোগ লিভারের যথেষ্ট ক্ষতি করে । অতএব ইহার যথার্থ চিকিৎসার প্রয়োজন । অতিরিক্ত বা অনিয়মিত পানাহার, গুরুপাক দ্রব্য আহার, উত্তেজক বা উগ্র দ্রব্য পান, অতিরিক্ত শারীরিক এবং মানসিক পরিশ্রম পরিহার করা উচিৎ । সাধারণ স্বাস্থ্য সম্মত নিয়মগুলো পালন করা উচিৎ । যথেচ্ছ ঔষধ গ্রহণের ফলে আজকাল লিভারের দোষ অতি ব্যাপক ভাবে দেখা দিয়েছে । সংক্রমণ, যকৃৎ প্রদাহের ক্ষেত্রে আমাদের খদ্য পানীয় সম্বন্ধে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে । ক্লোরিন হেপাটাইটিসের ভাইরাস ধ্বংস করতে পারে । এইজন্য ক্লোরিন মিশিয়ে পরিশোধন করে নেয়া উচিৎ । রক্ত প্রদানের ক্ষেত্রে রক্ত ভাইরাস যুক্ত কিনা সে বিষয়ে সুনিশ্চিত হতে হবে । সংক্রামক যকৃৎ প্রদাহের ক্ষেত্রে রোগীর পক্ষে পূর্ণ বিশ্রাম দরকার । যতদিন পর্যন্ত রোগী সুস্থ হয়ে না উঠে ততদিন পর্যন্ত বিশ্রামের প্রয়োজন । লঘু ও পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে । খাদ্যে কোন চর্বি জাতীয় পদার্থ থাকবে না । রোগীর জন্য গ্লুকোজ পানীয় এবং প্রোটিনযুক্ত খাদ্যের ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন । খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে রোগীর ইচ্ছা এবং অনিচ্ছা বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন । রোগীর সেবাকারীদের স্বাস্থ্যসম্মত বিধিগুলো কঠোর ভাবে মেনে চলতে হবে । রোগীর মলমুত্র অপসারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে । রোগী যদি দীর্ঘদিন জণ্ডিস রোগে আক্রান্ত হয় তৎসহ বমি ও বমিভাব, ক্ষুধাহীনতা জ্বর, লিভার বেদনা, চর্ম উদ্ভেদ ইত্যাদি থাকে তবে বুঝতে হবে অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে । আজকাল অত্যাধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে বটে কিন্তু সাধারণ লোকের পক্ষে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো সম্ভব নয় । অতএব খাদ্য, পানীয়, বিশ্রাম ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হতে হবে যাতে রোগ না হয় ।