19/08/2026
আমার তৃতীয় প্রেগনেন্সির পর যখন আমি প্রথম বুঝতে পারলাম যে, আমার মধ্যে কিছু একটা ঠিকঠাক নেই, তখন আসলে সমস্যাটা শুধু “ঘুম হচ্ছে না”—এতটা সরল ছিল না।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। শরীরটাকে কোনো একটা comfortable position-এ নিয়ে কয়েক ঘণ্টা নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকাও যেন অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। শরীর ভারী হয়ে গিয়েছিল, ওজন অনেক বেড়ে গিয়েছিল, সারাক্ষণ একটা অস্বস্তি, ক্লান্তি, ঘুমের অভাব—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি নিজের শরীরের মধ্যেই যেন আটকে আছি।
আর এর পেছনে ছিল টানা তিনটা pregnancy।
একটা pregnancy-ই একজন নারীর শরীর ও মনের ওপর কতটা ধকল ফেলে, সেটা যে কখনো এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়নি তাকে বোঝানো কঠিন। সেখানে পরপর তিনটা pregnancy। প্রতিবার প্রায় দশ মাস করে শরীরের ভেতর একটা মানুষকে বহন করা। শরীরের পরিবর্তন, ওজন বেড়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, সারাক্ষণ ক্লান্ত থাকা—তারপর delivery-এর ধকল। এরপর আবার সেই newborn-এর দায়িত্ব।
একটা pregnancy শেষ হওয়ার পর শরীর-মনকে স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই আরেকটা pregnancy।
এভাবে দিনের পর দিন চলতে চলতে একটা সময় আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—আমি একা হয়ে গিয়েছিলাম।
আমার স্বামী এমন একজন মানুষ, যার কাছ থেকে ওই সময়টাতে সবচেয়ে বেশি support পাওয়ার কথা ছিল। অথচ বাস্তবে তার আচরণ ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আমার কষ্টটা যেন তার কাছে কষ্টই ছিল না। মনে হতো, পৃথিবীতে কষ্ট যদি কারও হয়ে থাকে, তাহলে শুধু তারই হয়েছে। আমি কীভাবে আছি, আমার শরীর কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আমি রাতে ঘুমাতে পারছি কি না, আমি মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পড়ছি—এসব যেন তার কাছে কোনো গুরুত্বই পেত না।
আমি যখন ঘুমাতে পারতাম না, তখনও আমাকে এমনভাবে দেখা হতো যেন এটা আমারই সমস্যা।
আমি যখন নিজের শরীর নিয়ে struggle করছিলাম, তখনও সেটা যেন আমারই ব্যর্থতা।
আমি যখন তিনটা pregnancy, তিনটা delivery, অসংখ্য রাতের ঘুমহীনতা আর বাচ্চাদের দায়িত্ব সামলে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম, তখনও আমাকে এমন একটা অনুভূতি দেওয়া হয়েছে যে—সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী।
আজ এত বছর পরও সেই কথাগুলো মনে পড়লে আমার খুব অবাক লাগে।
একজন নারীকে বলা হয়, “তুমি মা। তোমার তো বাচ্চার জন্য সব করতে হবে।”
কিন্তু কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না—
“তোমার জন্য কে করবে?”
বাচ্চা রাতে ঘুমাচ্ছে না—মা উঠবে।
বাচ্চা কাঁদছে—মা সামলাবে।
বাচ্চা অসুস্থ—মা জাগবে।
বাচ্চাকে খাওয়াতে হবে—মা করবে।
বাচ্চার কাপড়, গোসল, ঘুম, ডাক্তার, স্কুল—সবকিছু মায়ের দায়িত্ব।
আর এর মাঝখানে মা যদি বলে, “আমি খুব ক্লান্ত”, তখন তাকে বলা হয়—
“সব মায়েরই তো এসব করতে হয়।”
হ্যাঁ, সব মায়েরই হয়তো অনেক কিছু করতে হয়।
কিন্তু তাই বলে একজন মায়ের ক্লান্তি কি অদৃশ্য হয়ে যায়?
একজন মানুষের শরীর কি অসীম?
একজন মানুষের ঘুমের প্রয়োজন কি কমে যায় শুধু সে মা হয়ে গেছে বলে?
আমি মনে করি, এখানেই আমাদের সমাজের একটা ভয়ংকর ভুল আছে। আমরা motherhood-কে এমনভাবে দেখি যেন সন্তান জন্ম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন নারীর সমস্ত মানবিক প্রয়োজনের অধিকার শেষ হয়ে যায়।
তার ঘুম লাগবে না।
তার বিশ্রাম লাগবে না।
তার একা একটু বসে থাকার প্রয়োজন নেই।
তার নিজের শরীর নিয়ে insecurity থাকতে পারবে না।
তার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার অধিকার নেই।
তার সাহায্য চাওয়ার অধিকার নেই।
কারণ সে “মা”।
কিন্তু মা হওয়ার আগে সে একজন মানুষ।
আর সেই মানুষটারও ঘুম লাগে। বিশ্রাম লাগে। ভালোবাসা লাগে। নিরাপত্তা লাগে। সহযোগিতা লাগে। মাঝে মাঝে এমন একজন মানুষ লাগে যে বলবে—
“তুমি একটু ঘুমাও। বাচ্চাটাকে আমি দেখছি।”
আমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুঃখের জায়গাটা হলো, এই পুরো সময়টা পার হয়ে যাওয়ার পরও আমার বাচ্চাদের সঙ্গে আমার bonding এখনও সেভাবে ভালো হয়নি।
এটা স্বীকার করাটাও আমার জন্য সহজ নয়।
কারণ একজন মা যখন বলে, “আমার নিজের বাচ্চার সঙ্গেই আমার bonding ভালো হয়নি”, তখন সমাজ খুব সহজেই তাকে বিচার করে।
“মা হয়ে এমন কীভাবে হয়?”
“নিজের বাচ্চার প্রতি মায়া নেই?”
“মা তো মা-ই।”
কিন্তু কেউ যদি একটু থেমে প্রশ্ন করে—
একজন মা যখন বছরের পর বছর ঘুমের অভাব, শারীরিক ক্লান্তি, পরপর pregnancy, delivery, weight gain, hormonal পরিবর্তন, মানসিক চাপ আর relationship-এর অসহযোগিতার মধ্যে থাকে—তখন তার সঙ্গে নিজের সন্তানের সম্পর্কটা তৈরি হতে সময় লাগতে পারে না?
মাতৃত্বের সঙ্গে সঙ্গে যে instant magical bonding-এর গল্প আমরা শুনি, বাস্তব জীবন সবসময় তেমন হয় না।
কখনও কখনও একজন মা তার সন্তানকে ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসাটা অনুভব করার মতো মানসিক space তার থাকে না।
কখনও তিনি বাচ্চার যত্ন নেন, কিন্তু নিজের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেন।
কখনও সন্তানকে কোলে নিয়ে বসেও মনে হয়—“আমি এত ক্লান্ত কেন?”
কখনও নিজের সন্তানকে ভালোবাসার পাশাপাশি তার কাছ থেকেই একটু দূরে যেতে ইচ্ছে করে।
আর এসব অনুভূতি থাকলেই একজন মা খারাপ মা হয়ে যান না।
বরং অনেক সময় প্রশ্নটা মায়ের চরিত্রে নয়।
প্রশ্নটা হলো—
এই মাকে এতদিন ধরে কে ধরে রেখেছিল?
আমি যদি ওই সময়টাতে একটু বেশি ঘুমাতে পারতাম?
যদি কেউ আমার পাশে বসে বলত, “আজ তুমি কিছু করবে না, আমি বাচ্চাদের সামলাচ্ছি”?
যদি আমার স্বামী আমার শরীরের পরিবর্তন নিয়ে আমাকে দোষ না দিয়ে আমাকে বুঝতে চেষ্টা করত?
যদি আমার ক্লান্তিকে আলস্য না বলা হতো?
যদি আমার মানসিক অবস্থাটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো?
যদি কেউ আমাকে বলত, “তোমারও সাহায্য দরকার হতে পারে”—তাহলে কি আজ আমার motherhood-এর অভিজ্ঞতাটা অন্যরকম হতে পারত?
আমি জানি না।
হয়তো পারত।
হয়তো পারত না।
কিন্তু আমি এটুকু জানি—একজন মায়ের কাছ থেকে বছরের পর বছর নিখুঁত motherhood আশা করার আগে তার চারপাশের মানুষগুলোর নিজেদের দায়িত্বটা দেখা দরকার।
একজন মা একা একটা পরিবার তৈরি করেন না।
একজন মা একা একটা সন্তান বড় করেন না।
একজন মায়ের শরীর দিয়ে সন্তান পৃথিবীতে আসে—কিন্তু সেই সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব পুরো পরিবারের।
আর স্বামী যদি মনে করেন, “বাচ্চা হয়েছে, এখন সবকিছু মায়ের দায়িত্ব”—তাহলে তিনি শুধু স্ত্রীকে একা করছেন না, তিনি নিজের সন্তানকেও একজন emotionally available বাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন।
আজও যখন আমার স্বামী আমাকে দোষারোপ করে, তখন আমার ভেতরে একটা প্রশ্ন আসে—
আমি যখন পরপর তিনটা pregnancy-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তুমি কোথায় ছিলে?
আমি যখন ঠিকমতো ঘুমাতে পারছিলাম না, তখন তুমি কোথায় ছিলে?
আমি যখন নিজের শরীরটাকে চিনতে পারছিলাম না, তখন তুমি কোথায় ছিলে?
আমি যখন ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তুমি কি একবারও ভেবেছিলে—এই মানুষটাকে একটু বিশ্রাম দরকার?
আমি যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলাম, তখন তুমি কি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে—
“তুমি ঠিক আছো?”
নাকি আজকের মতো তখনও শুধু আমাকে দোষ দেওয়াটাই সহজ ছিল?
সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার, একটা সময়ের পর মানুষ শুধু সেই সময়টার কষ্টে থাকে না। সেই সময়টার প্রভাব অনেক বছর পরেও থেকে যায়।
আমার বাচ্চাদের সঙ্গে আমার bonding-এর জায়গাতেও তার ছাপ আছে।
আর এটাই হয়তো motherhood নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি কথা বলা দরকার এমন একটা বিষয়।
মাকে শুধু মা হিসেবে দেখবেন না।
মায়েরও একটা শরীর আছে।
মায়েরও একটা মস্তিষ্ক আছে।
মায়েরও একটা সীমা আছে।
মায়েরও ঘুম দরকার।
মায়েরও বিশ্রাম দরকার।
মায়েরও কান্না পায়।
মায়েরও কখনও কখনও মনে হয়, “আমি আর পারছি না।”
সেই মুহূর্তে তাকে দোষারোপ করার আগে, তাকে একটু জিজ্ঞেস করুন—
“তুমি শেষ কবে ঠিকমতো ঘুমিয়েছ?”
আর সম্ভব হলে শুধু প্রশ্ন করে থেমে থাকবেন না।
বাচ্চাটাকে নিজের কোলে নিন।
মাকে বলুন—
“তুমি ঘুমাও। আমি আছি।”
কারণ কখনও কখনও একজন মায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো উপদেশ নয়।
শুধু একজন মানুষ, যে সত্যিই থাকবে।