27/11/2020
বাসার কাজের মেয়েটিকে বড় বউ জিজ্ঞাসা করল, তোমার তো বিয়ে হয়েছিল, তো ভাঙলো কিভাবে?
মেয়েটি পেঁয়াজ কাটা বন্ধ করে উদাস মনে মাথাটা নিচু করে বলল, আমিই ছাইড়া দিছি।
কেন?
আফা! শাশুড়ি সারাদিন কাম করাইতো। এত্তো খাটান খাটাইতো যে আর পারলাম না।
তো! এখন কি করো?
কোনো জবাব না দিয়ে হেসে দিয়ে বলল, এহনো কাম করি।
ফরিদপুরে বেশ কয়েকটা 'মেয়েদের অনলাইন উদ্যোক্তা গ্রুপে' এ্যাড থাকায় প্রতিদিন বেশকিছু উদ্যোক্তার সাথে সামান্য কথা হয়।
ঘটনা হলো- সেদিন একটা মেয়ের সাথে সামান্য ইনবক্সে চ্যাটিং হল। মেয়েটি ছিল গরুর ভূড়ির উদ্যোক্তা।
গরুর ভুড়ি পরিস্কার করে একেবারে রান্না করার উপযোগী করে বিক্রি করে। এমন বিক্রেতা অন্তত ১০/১২ জন আছে। আমি এদের প্রোফাইলগুলা ঘুরেঘুরে দেখি। বেশ সাজানো-গোছানো, পরিপাটি মেয়ে। আমি দেখলাম- এই যে ব্যবসার নামে, নিজ পায়ে দাড়ানোর নামে মেয়েগুলা এখন গর্বের সাথে বিজ্ঞাপন দিয়ে গরুর ভুড়ি পরিস্কার করে বেঁচতেছে.... এই মেয়েগুলাই ঘর সংসার করার সময় কখনো যদি জামাই বলে- গরুর ভুড়ি খাইতে মন চাইতেছে। একটু পরিস্কার করে রান্না করবা?
এরপরে এদের প্রতিক্রিয়া হবে- সংসারের আয়ু ওখানেই শেষ।
ব্যাপারটা একদমই বানিয়ে বানিয়ে বলতেছি না। জীবন থেকে নেয়া।
সবাই এক রকম না। তবে, বেশিরভাগই এমন।
তুমি আমাকে খাইস্টা পাইছ? তোমার এত বড় সাহস তুমি আমাকে গরুর ভুড়ি সাফ করতে বলো? আমার বাপের বাড়িতে আমি কোনদিন নিজের হাতে ভাত পর্যন্ত খাইনি..... অমুক সমুক.... কত চুল....
একেবারে আমার বাড়ির কাজের বুয়ার মত....
আরেকটা পরিচিত উদ্যোক্তাকে ইনবক্সে জিজ্ঞাসা করলাম, বিজনেস কেমন চলছে।
আর ভাইয়া বলবেন না,খুবই ভালো চলছে। সারাদিন রান্না-বান্না করতে হচ্ছে। কাস্টমারের ভালো রিভিউ এর জন্য সারাদিন ব্যস্ত থাকি। বাচ্চাটার দিকে একটু খেয়াল করার সময় পাই না। ভাবছি ওকে একটা ডে কেয়ারে দিয়ে দেব। সন্তানের ভবিষ্যতটা যাতে ঠিক থাকে।
স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়েটিকে আর কোনো রিপ্লাই না দিয়ে শুধু একটা লাইক দিয়ে স্কীপ করলাম।
অথচ, ও ওর স্বামীকে ছেড়ে দিয়েছিল অসুস্থ শাশুড়ির খেদমত করা নিয়ে দ্বন্দ্বে।
একজনকে দেখলাম এ মাসে তার কত টাকার থ্রী-পিচ বিক্রী হয়েছে তার রিভিউ দিচ্ছে। এ মাসে আঠারো হাজার পাঁচশ টাকা বিক্রী হয়েছে। ক্যাপশনে লিখেছে আলহামদুলিল্লাহ্।
তার প্রোফাইল চেক করে দেখলাম, সে শুধুমাত্র নিজের একটা পরিচয় থাকবে এ জন্য অনলাইন বিজনেস শুরু করেছে।
মুসলিম ধার্মিক (যেহেতু ক্যাপশনে 'আলহামদুলিল্লাহ্' লিখেছে তাই বললাম আর কি) একটি মেয়ে শুধু সমাজে নিজের একটি পরিচয়ের জন্য বিজনেস করছে, নিজের ছবি,মোবাইল নম্বর পাবলিক করছে, সন্ধ্যার পরে নিজে গিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে হোম ডেলিভারী দিয়ে আসছে.... ক্যামনে সম্ভব বুঝিনা।
বাজবাড়ীর বউ ফরিদপুরের মেয়ে। বিদেশী কসমেটিকসের ব্যবসা করে। প্রতিদিন বেশ কিছু পোস্ট চোখে পড়ে। তিনটা তার প্রোডাক্টের পিকচার, একটা তার নিজের পিকচার। এভাবে চারটা করে ছবি প্রতিদিন পোস্ট করছে। তাকে কমেন্টে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার নিজের ছবি প্রতিদিন দেয়ার কারন কি?
কমেন্টে সেদিন মাত্র তেইশটা মেয়ে আমাকে গালিদিয়ে বুঝিয়ে দিল, তাতে আমার কি!ভালো না লাগলে স্কীপ করেন, এভাবে ব্যঙ্গ করার মানে কি! মা বোন কি ঘরে নাই!প্রোফাইল দেখে তো হুজুর মনে হয়, এখানে কি করেন! একজন তো বলল, হুজুর হয়ে ফেসবুক ব্যবহার! লুইচ্চা হুজুর ব্লা ব্লা ব্লা.....
ওদের রিপ্লে করা দেখে ভয়ে কমেন্ট ডিলিট করছি।
এই হল তাদের অবস্থা। জানি সবাই এক না।হয় শুধুমাত্র ওই তেইশ জনই খারাপ, বাকিরা সব ভালো। না হয় আমি খারাপ, ওই তেইশ জনই ভালো।
একটা মধু আপুকে দেখলাম মধুর ব্যবসা করে। নিজেই নিজের নিকনেম দিয়েছে "মধু আপা"। তিনিও নিজেই বাইসাইকেলে করে মধু হোম ডেলিভারী দিয়ে দেন। তার কোনো অভাব নেই। শুধুমাত্র নিজে কিছু করবেন আর স্বাধীনতার জন্য এই বিজনেসটা করে।
তাকে একদিন চ্যাটিংএ বললাম, সমাজে ছেলেরা মেয়েদের থেকে সবসময় এগিয়ে থাকে কেন জানেন?
সে বলল, আপনাদেরকে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিই করেছেন বড় করে তাই।
আমি বললাম, ভূল। সঠিকটা হল, একটা ছেলে যতদিন বাপের হোটেলে খায় ততদিন সে নিজেকে স্বাধীন মনে করে। যেদিন সে চাকরী বা ব্যবসায় নামে বা সংসারের দায়িত্ব ঘাড়ে নেয়, সেদিন থেকে সে নিজেকে পরাধীন ভাবে। আর একটা মেয়ে যতদিন বাপের হোটেলে খায়, ততদিন সে নিজেকে পরাধীন ভাবে।
যেদিন সে চাকরী বা ব্যবসা শুরু করে বা সংসারের দায়িত্ব ঘাড়ে নেয়, সেদিন থেকে সে নিজেকে স্বাধীন ভাবে। যেটা বোকামী ছাড়া অন্য কিছু না।
মূলত আপনাদের চিন্তা ধারাতে সমস্যা।
তারপরই ব্লক.....
ফেসবুকে এখন নতুন ডিবেট শুরু হয়েছে বোনদের ব্যবসা করা নিয়ে। দ্বীনদার হয়েও বোনেরা কেন ব্যবসা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন, তারা কি সুপ্ত ফেমিনিজমে আক্রান্ত কি না এটাই বিতর্কের মূল বিষয়বস্তু। পুরো বিতর্কে বোনদের পক্ষে নিশ্চয়ই কিছু ভুলত্রুটি আছে, আবার ভাইদের পক্ষ থেকেও অনেকেই সীমা অতিক্রম করেছেন, এসব আদব-কায়দা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, বরং আমি একজন মুসলিম হিসেবে মুসলিম বোনদের প্রতি কিছু কথা বলছি....
আগেই বলে রাখি, শরিয়ত সম্মত অপারগ হলে যেখানে শুকুরের গোশত খাওয়া জায়েজ, সেখানে শরিয়ত সম্মত বিপদগ্রস্থ মেয়েদের নিয়ে আমি কিছু বলবো না।কারন, তারা একেতো অপারগ, দ্বিতীয়ত তাদের সমস্যার সমাধান অনেক গবেষণার ব্যাপার।
আমার কথাগুলো যারা অপারগ নয়।শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে চিন্তা করে বিজনেস করছে, তাদের নিয়ে.....
আমি সাধারণত ফেসবুকের ডিবেটগুলো থেকে কনশাসলি দূরে থাকার চেষ্টা করি। এবারের বিষয়টা নিয়ে কদিন থেকেই কিছু কথা মাথায় ঘুরছিল, সত্যি বলতে ডিবেট শুরু হওয়ারও আগ থেকেই নিয়্যত ছিল কথাগুলো বলার, কিন্তু সময়ের অভাবে লিখতে পারি নি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে হলো কথাগুলো বলা এবং বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান যুগে ছোটোবেলা থেকে কয়েকটা ব্যাপার শুনে আমাদের সমাজের নারীরা বড় হয় যেমন,
১। আমাদেরকে বড় হয়ে কিছু একটা হতে হবে, প্রফেশনাল ক্যারিয়ার থাকতে হবে। এর জন্য ছোটোবেলা থেকেই প্রিপারেশন নিতে হবে। দ্রুত বিয়ে করা, অধিক সন্তান নেয়া - এই ব্যাপারগুলো এখানে নেগেটিভ কিংবা ‘ব্যাকডেটেড।’ সংসার সামলানোকে বলা হয়ে ‘বসে থাকা’, আর ঘরের বাইরের কাজই হচ্ছে ‘কাজ।’
২। শুধু মা কিংবা শুধু স্ত্রী হওয়াটা সমাজের চোখে তেমন আকর্ষণীয় কিছু না, আপনাকে সম্মান পেতে হলে, নিজের একটা আলাদা পরিচয় থাকতে হবে, অর্থাৎ মা বা স্ত্রী ছাড়াও আলাদা আরেকটা কোনো পরিচয়। সেটা কিন্তু নিয়মিত 'দান-সাদাকাকারী' বা 'রোজাদার' ইত্যাদি পরিচয় হলে হবে না, সেটা অবশ্যই কোনো একটা ক্যারিয়ার বা প্রফেশনের সাথে যুক্ত হতে হবে, তা নাহলে আপনার তেমন কোনো দেয়ার মতো “পরিচয়” নেই।
৩। নারীদেরকে স্বাবলম্বী হওয়ার দীক্ষা দেয়া হয়। নিজের কিছু উপার্জন থাকা ভালো, এই শিক্ষা দেয়া হয়। এবং তাদের মাথায় এই ভয় ঢোকানো হয় যে, স্বামী যদি না দেখে কিংবা মরে যায়, তাহলে তোমার কী হবে? অথবা, তুমি যদি নিজে টাকা কামাও, তাহলে স্বামী তোমাকে অসম্মান করতে ভয় পাবে।
উপরে যা বললাম, এগুলো সমাজের সেকুলারাইজেশন প্রক্রিয়ার অংশ। ছোটোবেলা থেকে এভাবেই আমাদের সমাজের নারীদের‘ব্রেইন-ওয়াশ’ করা হয়। এটা খুব দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া। দিনের পর দিন যখন একটা মেয়ে আপন মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবী, স্কুল-কলেজ, পাড়া-প্রতিবেশী,মিডিয়া ওভারঅল পুরো সোসাইটির কাছ থেকে একই কথা শুনে বড় হবে, তখন এটা তার মনন ও মস্তিষ্কে অবশ্যই প্রভাব বিস্তার করবে। সমাজের বেশিরভাগ মেয়েকেই তাই আমরা দেখি যে তারা উপরের মতোই চিন্তাধারা পোষণ করে। দ্বীনদার বোনেরা আলহামদুলিল্লাহ কনশাসলি কিছু বিষয় থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেন। যেমন - অল্প বয়সে বিয়ে করার প্রয়োজনীয়তা, (সম্ভব হলে) অধিক সন্তান নেয়ার চেষ্টা করা, ক্যারিয়ার নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের সংসার নষ্ট না করা ইত্যাদি। কিন্তু তারপরেও ফেমিনিজমের কিছু প্রভাব অনেকের মধ্যে থেকেই যায় আর এ কারণেই সম্ভবত ‘কিছু একটা করতে চাওয়ার’ এ প্রবণতা।
এখানে প্রথম কথা হলো, আমরা সমাজের এই ট্রেন্ড থেকে বের হয়ে আসলে চাই যে, আমাদের একটা উপার্জন থাকতেই হবে। সুবহানআল্লাহ, আজকে আমি ফেসবুকে যেদিকেই তাকাচ্ছি, মনে হচ্ছে যেন প্রত্যেকটা বোনই ব্যবসা করছে। আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, এই প্রত্যেকটা বোনেরই উপার্জন করার খুব জরুরি প্রয়োজন আছে। অতিরিক্ত আর্নিং এর আশায় শখের বশে সবাই বেচাকেনায় নেমে পড়েছেন, এটা হজম করাটা দুঃখজনক।
--- দ্বিতীয়ত, উপার্জন করতে গেলেও অনেক সময় এমন হয় যে, গায়রে-মাহরামদের সাথে কাজ করতে হচ্ছে, বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরোনো লাগছে, এমন পরিবেশে যাওয়া লাগছে, যা হিজাব পালন করা নারীদের জন্য সত্যিই অস্বস্তিকর। এসব কারণে বলছি, যদি নিতান্ত প্রয়োজন না থাকে, তাহলে শখের বশে কেন এই পথ নিজের জন্য বেছে নেবেন? দিনের শেষে কি আপনার খারাপ লাগবে না এমন পরিবেশে নিজেকে ঠেলে দেয়ার জন্য?
--- তৃতীয়ত, যদি আপনার অফুরন্ত অবসর থাকে, বা পরিবারের কাজ করতে করতে হাপিয়ে উঠে আপনি নিজের মানসিক বিকাশ বা স্বস্তির জন্য কিছু হালাল কাজ করতে চান, সেক্ষেত্রে চিন্তা করুন তো বোন, আপনাকে কেন ‘ব্যবসাই করতে হবে’? আল্লাহ তো উপার্জের দায়িত্ব নারীদেরকে দেন নি। অবশ্যই টাকার প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষাটা সহজাত। কিন্তু আল্লাহ যদি আপনাকে “কিছু একটা” করার সময় দিয়ে থাকে, সে কিছু একটা কেন ‘ব্যবসা’ হতে হবে?
আমি মনে করি, যেসব বোনদের অর্থের প্রয়োজন নেই, তারা স্রেফ ‘কিছু একটা করা’র স্বার্থে ‘অর্থ-কেন্দ্রিক’ কাজে ব্যস্ত না হয়ে ‘খিদমাহ-কেন্দ্রিক’ বা ‘সার্ভিস-বেইসড’ কাজের কথা চিন্তা করতে পারেন। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে যে, অর্থের ইনভলভমেন্ট থাকলেই ‘কিছু একটা করা’ হলো, আর অন্য কিছু করা মানেই ‘কিছু না।’
নন-মনিটারি বা সার্ভিস বেইসড কাজ তাহলে বোনদের জন্য কী হতে পারে? স্রেফ কয়েকটা আইডিয়া দিচ্ছি। এটা নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তারই সুযোগ আছে। যেমন--
- ইলম অর্জন। এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে থেকে বের করে আরো বেশি সহজলভ্য করা। সেকুলারাইজেশনের দৌরাত্ম্যের এ যুগে বোনদের মধ্যে দ্বীনের বুঝ আশঙ্কাজনকভাবে কম, অথচ তাদের হাতেই পরবর্তী জেনারেশনকে দেখভাল করার দায়িত্ব। শুরুটা হতে পারে হায়েজ, নিফাস ,তাজউয়িদ বা সঠিক নিয়মে কুরআন তিলাওয়াতের কোনো কোর্স দিয়ে। এরপর আস্তে আস্তে আরেকটু অ্যাডভান্সড বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলেন। একটা পর্যায়ে যখন এগুলো রপ্ত করবেন তখন এ বিষয়গুলো নিয়ে অন্যদেরকে শেখাবেন এবং লেখালেখি করবেন। এগুলোকে ইসলামি ‘দায়িত্ব’ হিসেবে নেবেন।
- আপনি হিফজ করতে পারেন। কুরআনের প্রতিটা আয়াত জান্নাতে আপনার পদমর্যাদা এক ধাপ, এক ধাপ করে বাড়িয়ে দেবে।
- হাতে সময় এবং কমিটমেন্ট থাকলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কোর্সে ঢুকতে পারেন, যেমন - ইসলামি কোনো একটা সাবজেক্ট নিয়ে ব্যাচেলরস করা বা মাদ্রাসায় মাওলানা পড়া। আর এখন এগুলো অনলাইনে অনেক অ্যাভেইলেবল।
- আরবি শেখার জন্য আপনি সময় দিতে পারেন, কারণ কুরআন বুঝতে আরবি শেখার কোনো বিকল্প নেই। আর আপনার যদি ইতিমধ্যে দ্বীনের কিছু ইলম থেকে থাকে, তাহলে সেটা উম্মাহর স্বার্থে কাজে লাগান। যেমন - ফ্রি তে বোনদেরকে আরবি শেখান, তাজউয়িদ শেখান।
- হিজামা পারলে বোনদেরকে হিজামা করে দিন। কত দরকারি একটা কাজ!
- লেখালেখির অভ্যাস থাকলে ইসলামি আর্টিকেল, বই ইত্যাদি লিখুন। ইংরেজিতে ভালো হলে অনুবাদের কাজ করুন। একটা সিরিয়াস প্রজেক্ট হিসেবে পরিকল্পনার অধীনে কাজগুলো করুন, স্রেফ যা-মাথায়-আসলো তা নয়।
- নিজের বাসায় সপ্তাহে একদিন দ্বীনি আলোচনা করুন। সেখানে পাড়া-প্রতিবেশি, বান্ধবীদের দ্বীনের দাওয়াত দিন।
- আপনি ভালো রাঁধতে জানেন, দাওয়াত দিয়ে মানুষকে দ্বীনের কথা বলুন।
অনেকে বলতে পারেন, কাজের বিনিময়ে টাকা নেয়াটা কি দোষের কিছু? না, টাকা নিতে দোষ নেই। বা ইসলামি কাজ মানেই ফ্রি হতে হবে সেটাও নয়। কিন্তু যে বোনদের প্রয়োজন নেই, টাকা কামানো যেন তাদের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত না হয়, এটা জরুরি। বিশেষ করে, আমরা যারা স্বচ্ছল, তারা কেন আমাদের মূল্যবান সময় বেঁচাকেনা বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করব যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হচ্ছে না? ওপরের যে কাজগুলোর উদাহরণ দিলাম সেগুলো দিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘোরে না কিন্তু ইসলামের চাকা ঘোরে। এই ক্রাইসিসের সময়টায় উম্মতের অর্ধেক হিসেবে আপনাদের উপর অনেকটাই দায়িত্ব এসে বর্তায় যে আপনারা অর্থ-কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে বরং উম্মাহর সেবায় অধিক আগ্রহী হন।
আমাদের জীবন সংক্ষিপ্ত আর জীবনের সময়গুলো অল্প কিছু কাজেই ইনভেস্ট করতে পারব। তাই টাকা উপার্জনই যেন আপনাদের মূল লক্ষ্য হয়ে না দাঁড়ায়। বিশেষ করে, আমাদের অর্থাৎ নারীদের। চাকরি ও ক্যারিয়ারকে পায়ে ঠেলে যারা দ্বীন পালনে উৎসাহী হয়েছে, এখন যেন ফেসবুকের একটা সহজ টাকা-কামানোর প্ল্যাটফর্ম পেয়ে এই ফিতনায় জড়িয়ে না যান। নিশ্চয়ই আপনাদের জীবনে কিছু প্রায়োরিটি থাকা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কতটা দীনহীন হালতে জীবন কাটিয়ে গেছেন, সে কথাটা যেন আমরা মাথায় রাখি। (আমি গরিবি হালতে চলতে বলছি না, তবে সম্পদের লোভ যেন পেয়ে না বসে সেটাই বলছি।) প্রিয় নবীর অন্তরে সবসময় থাকতো উম্মতের ফিকির। আমাদের মধ্যে উম্মতের জন্য সে ফিকির কোথায়?
আমাদের সমাজে জাহেলিয়াতের জয়-জয়কার। হাজারো নারীরা দ্বীনের আলো পাচ্ছে না। হাজারো মেয়েরা দ্বীনের বুঝ কিছুটা পেয়েও সঙ্গ এবং পরিবেশের অভাবে ইসলামের সরলপথ থেকে ছিটকে পড়ছে। অনেকে মুসলিম থেকে নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নিজের ‘কিছু একটা করতে চাওয়া’ থেকে বরং এই ভয়ংকর জাহেলিয়াত থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য আপনি কিছু করতে পারেন। আপনার কোন যোগ্যতা বা জ্ঞানকে ইসলামের পক্ষে কাজে লাগানো যায়। যেমন- আপনি এসব জাহেল বোনদের জন্য কিছু লিখুন। সময় বের করে অন্তত দু জন বোনকে ব্যক্তিগত ভাবে দাওয়াহ দিন। পাঁচ জন বোনকে কুরআন পড়তে শেখান। কয়েকজন বোনের ডিপ্রেশন দূর করতে তাকে কাউন্সিল করুন, সময় দিন, সঙ্গ দিন, পজিটিভ কথা বলুন। যে যেভাবে পারেন, উম্মাহর খেদমতে নিজেকে কাজে লাগান। আল্লাহর সৈনিক হিসেবে দ্বীনের সেবা করুন। কিংবা যোগ্যতা না থাকলে, নিজের মধ্যে সে যোগ্যতা তৈরির জন্য সময় দিন। আর যদি এগুলোর কিছু করার অবস্থা বা পরিস্থিতি না থাকে, তাহলে আপনাকে কেউ বাধ্য করছে না। কিন্তু নিজের অবস্থাই যদি কারো এত শোচনীয় হয় যে মানুষকে দেয়ার মতো কিছুই তার ঘটে নেই, তাহলে সে কেন প্রয়োজন ছাড়া টাকার পিছে ছুটবে? তার জন্য তো নিজেকে ইসলামের আলোকে সাজিয়ে তোলা আরও বেশি জরুরি।
নিজের নিয়্যতকে প্রশ্ন করুন বোনেরা, বারবার নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ করুন। আর্নিং করতে চান কেন? আদৌ জরুরত আছে? নাকি এমনি শখ, আনন্দ বা অবসর কাটাতে? যদি কারণ না থাকে, তাহলে চিন্তা করুন, এরচেয়ে জরুরি কোনো কাজ কি আপনার জীবনে নেই, যেটা করে হয়ত আপনি আর্নিং করতে পারবেন না, কিন্তু আনন্দ পাবেন, শখ পূরণ হবে, বা অবসরকেও উত্তম কাজে লাগানো হবে?
নারী সাহাবীরা যে কেউই আর্নিং করেন নি, তা না। কিন্তু নারীদের আর্নিং করাটা সে যুগের পপুলার ট্রেন্ড ছিল না। সে যুগে নারীদের আর্নিং করাটাকে প্রশংসার নজরে দেখা হতো না, বরং তারাই সাধারণত বাইরে কাজ করতে গেছেন, যাদের খুব অভাব-অনটন বা আর্থিক প্রয়োজন ছিল। এটাকে তারা নিজেদের “পরিচয়” বা মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখতেন না। এবং অবশ্যই যারা প্রয়োজনের খাতিরে বাইরে কাজ করেছেন, তাদের জন্য পর্দা, কাজের পরিবেশ, কাজের ধরণ, হালাল নাকি হারাম, স্বামীর অনুমতি আছে কিনা, সংসারের প্রাথমিক দায়িত্বগুলো কোনোপ্রকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা এগুলিও বিবেচনায় রাখার বিষয় ছিল। হাতেগোণা খুব অল্প উদাহরণই আমরা হয়ত আনতে পারবো, যে নারীরা সে সময় বাইরে কাজ করতেন, বা প্রয়োজন ছাড়াও উপার্জন করতেন। বরং অধিকাংশ উদাহরণই আমরা এমন পাই যে নারীরা ইবাদত, আমল, ইলম অর্জন, সন্তান, পরিবার – মোট কথা সমাজ নির্মাণে ব্যস্ত ছিলেন। মোটাদাগে বললে, টাকা-কামানোটা তাদের কাজ ছিল না। এখনকার সময়ে দুই-একটা উদাহরণ টেনে নারীদের উপার্জন করাটাকে অনেকে পাইকারি রেটে জায়েজ বানিয়ে দেয়, কিন্তু ভাইবটা এমন থাকে যে বাকিরাও ভাবতে থাকে কিছু একটা করে উপার্জন করতে না পারাটা একটা ব্যর্থতা যেন! ইসলামের সেরা নারীদের কাহিনি পড়বেন, ইনশাআল্লাহ আপনারা নিজেরাই দেখবেন তারা এসব থেকে কত যোজন যোজন দূরত্বে বাস করতেন।
শেষ কথা বলব, ফেমিনিজমকে হয়তো আমরা ঘৃণা করি, কিন্তু জেনে না-জেনে সেই ক্যারিয়ার, নিজের একটা প্রফেশন থাকা, নিজে উপার্জন করা, নারী হয়েও স্বাবলম্বী হওয়া, নিজের একটা পরিচয় বানাবার এক সূক্ষ্ম দুষ্টচক্রে হয়ত আমরা পড়ে গেছি। তাই বোনদের সাবধান হওয়া জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, যেসব বোন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের চিন্তা বাদ দিয়ে উম্মাহর খেদমতের নিয়্যতে আল্লাহর পথে নিজেদের মূল্যবান সময় ও শ্রম ব্যয় করছেন ও করবেন, আল্লাহর নজরে তারা বেশি মর্যাদার অধিকারী।
(সংগৃহিত ও পরিমার্জিত)