02/08/2026
টার্গেটেড থেরাপি না ইমিউনোথেরাপি—কোন রোগীর জন্য কোনটা?
ক্যান্সার ধরা পড়ার পর আজকাল রোগী বা তাঁর পরিবারের কাছ থেকে একটা প্রশ্ন খুবই শুনি—
“ডাক্তারবাবু, কেমোথেরাপি না দিয়ে টার্গেটেড থেরাপি দেওয়া যায় না?”
আবার কেউ বলেন—
“ইমিউনোথেরাপি তো সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা। তাহলে সেটাই দিন না!”
সমস্যাটা এখানেই। টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি—কোনোটাই এমন ওষুধ নয় যে ক্যান্সার হলেই দিয়ে দেওয়া যাবে। সঠিক রোগীর জন্য সঠিক ওষুধটি বেছে নেওয়াই আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার আসল কথা।
ধরুন, একটা তালা রয়েছে। সেই তালার একটা নির্দিষ্ট চাবি আছে। ক্যান্সারের কোষের মধ্যেও অনেক সময় এমন একটি বিশেষ পরিবর্তন থাকে, যেটি সেই ক্যান্সারকে বাড়তে সাহায্য করছে। আমরা যদি সেই পরিবর্তনটাকে খুঁজে পাই এবং তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ওষুধ থাকে, তাহলে অনেক সময় সরাসরি ক্যান্সারের মূল চালিকাশক্তিটাকেই আঘাত করা যায়। এটাই টার্গেটেড থেরাপি।
যেমন ফুসফুসের ক্যান্সারে EGFR, ALK, ROS1, RET-এর মতো কিছু পরিবর্তন পাওয়া যেতে পারে। ব্রেস্ট ক্যান্সারে HER2 থাকতে পারে। এগুলোর জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ রয়েছে।
আর এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা।
যদি ক্যান্সারকে চালানোর মতো স্পষ্ট একটি target বা driver পাওয়া যায়, সাধারণত সেটিকে লক্ষ্য করে চিকিৎসাই আগে গুরুত্ব পায়। কারণ ক্যান্সারের মূল ইঞ্জিনটাই যদি বন্ধ করে দেওয়া যায়, অনেক ক্ষেত্রে রোগকে খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে।
ধরুন, একজন এমন মানুষের ফুসফুসের ক্যান্সার হয়েছে যিনি কোনোদিন ধূমপানই করেননি। পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁর ক্যান্সারে EGFR mutation রয়েছে। এই একটি পরিবর্তনই হয়তো ক্যান্সারটিকে মূলত চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এখানে শুধুমাত্র “ইমিউনোথেরাপি আধুনিক চিকিৎসা” ভেবে ইমিউনোথেরাপি দিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
EGFR-mutated lung cancer-এ সাধারণত ইমিউনোথেরাপি খুব ভালো কাজ করে না। বরং Osimertinib-এর মতো ওষুধ দিয়ে EGFR-কে সরাসরি target করলে অনেক বেশি উপকার পাওয়া যায়।
তাহলে ইমিউনোথেরাপি কোথায় বেশি কাজে আসে?
এবার একটু অন্যভাবে ভাবুন।
কিছু ক্যান্সারে একটা-দুটো নয়, ক্যান্সার কোষের মধ্যে অসংখ্য জিনগত ভুল বা mutation জমে যায়। একে আমরা বলি high tumor mutational burden। এত পরিবর্তনের ফলে ক্যান্সার কোষটি স্বাভাবিক কোষের থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে যায়। তখন আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাকে শত্রু হিসেবে চিনে নেওয়ার সুযোগ বেশি পায়। ইমিউনোথেরাপি সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আরও কার্যকরভাবে লড়তে সাহায্য করতে পারে।
এর সুন্দর উদাহরণ হলো ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ফুসফুসের ক্যান্সার।
সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক বছরের পর বছর ফুসফুসের কোষের DNA-তে অসংখ্য ক্ষতি তৈরি করতে পারে। ফলে সেই ক্যান্সারের মধ্যে অনেক mutation জমে যেতে পারে। এই ধরনের কিছু ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপিতে বেশ ভালো সাড়া দিতে পারে।
তবে এখানেও একটা সাবধানবাণী আছে। শুধু রোগী ধূমপায়ী ছিলেন বা mutation বেশি আছে বলেই ইমিউনোথেরাপি কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ক্যান্সারের ধরন, PD-L1, MSI/MMR, tumor mutational burden এবং আরও কিছু বিষয় দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
আবার টার্গেটেড থেরাপি আর ইমিউনোথেরাপি সবসময় একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে টার্গেটেড থেরাপি আগে আসে, কারও ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি। কোথাও কেমোথেরাপির সঙ্গে ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়। আবার কিডনি ক্যান্সারের মতো কিছু রোগে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি একসঙ্গেও ব্যবহার করা হয়।
তাই “টার্গেটেড থেরাপি ভালো, না ইমিউনোথেরাপি ভালো?”—এই প্রশ্নটাই আসলে ঠিক নয়।
সঠিক প্রশ্ন হলো—
“আমার ক্যান্সারটাকে চালাচ্ছে কে?”
যদি একটি নির্দিষ্ট driver-কে খুঁজে পাওয়া যায় এবং তার ওষুধ থাকে, তাহলে অনেক সময় সেটাকেই আগে target করতে হবে। আর যদি ক্যান্সারের জীববিজ্ঞান এমন হয় যে শরীরের immune system-কে কাজে লাগালে বেশি লাভ হবে, তখন ইমিউনোথেরাপি সামনে আসবে।
এই কারণেই আজকের দিনে শুধু “আমার লাং ক্যান্সার” বা “আমার ব্রেস্ট ক্যান্সার” জানাটা যথেষ্ট নয়। একই অঙ্গের দুজন মানুষের ক্যান্সারের চিকিৎসাও সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
সবচেয়ে নতুন ওষুধ সেরা নয়। সবচেয়ে দামি ওষুধও সেরা নয়। আপনার ক্যান্সারের দুর্বল জায়গাটা খুঁজে বের করে, ঠিক সেই জায়গায় আঘাত করতে পারে যে চিকিৎসা—আপনার জন্য সেটাই সেরা চিকিৎসা।