01/09/2026
বয়স মাত্র ৩০। পেশায় ব্যবসায়ী, বড় কোনো রোগ নেই বলেই জানতেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে পেটের উপরের দিকে একটা অদ্ভুত ব্যথা শুরু হয়েছে। খাওয়ার পর পরই বেশি হয়, আর পিঠের দিকেও যেন ছড়িয়ে যায়।
প্রথমে ভাবলেন, "গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা।" এলাকার ফার্মেসি থেকে অ্যান্টাসিড, গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ কিনে খাওয়া শুরু করলেন। সাময়িক আরামও পেলেন।
কিন্তু ব্যথাটা বার বার ফিরে আসে।
জেলা সদর হাসপাতালে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখালেন। তিনিও গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতোই চিকিৎসা দিলেন গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ, এন্টাসিড, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ। কিছুদিন ভালো থাকলেন, তারপর আবার একই ব্যথা।
এভাবে কয়েক মাসে অন্তত চার/পাঁচজন ডাক্তার দেখালেন। কেউ ভাবলেন গ্যাস্ট্রিক, কেউ সন্দেহ করলেন পিত্তথলিতে পাথর। আল্ট্রাসনোগ্রাম, লিভার ফাংশন টেস্ট সবই করানো হলো। কিন্তু রিপোর্ট বার বার নরমাল। পিত্তথলিতে পাথর নেই, লিভারও ঠিকঠাক।
তিনি রীতিমতো হতাশ হয়ে গেলেন। এত টেস্ট, এত ডাক্তার। অথচ কেউ বলতে পারছেন না সমস্যাটা আসলে কী।
একদিন মেডিকেলের এক ছোটভাই এর পরামর্শে গেলেন সদ্য এফসিফিএস পাশ করে বের হওয়া এক নবীন ডাক্তারের কাছে। পরিবারের অন্যরা শুনে মানা করলেন — বড় বড় ডাক্তার চিকিৎসা দিতে পারছে না, এত অল্প বয়সী ডাক্তার, কী বুঝবে!
কিন্তু এই ডাক্তার একটা কাজ করলেন, যেটা আগে কেউ অতটা মনোযোগ দিয়ে করেননিম রোগীর গত কয়েক মাসের সবগুলো রিপোর্ট, প্রতিটা প্রেসক্রিপশন একটা একটা করে খুঁটিয়ে দেখলেন সময় নিয়ে।
তিনি খেয়াল করলেন পিত্তথলি স্বাভাবিক, লিভার স্বাভাবিক, কিন্তু ব্যথার ধরন (খাওয়ার পর বাড়া, পিঠে ছড়ানো) আর সাথে সামান্য ওজন কমে যাওয়া, পুরো প্যাটার্নটা মিলছে আরেকটা অঙ্গের সমস্যার সাথে, অগ্ন্যাশয় বা Pancreas।
তিনি রোগীকে বোঝালেন যে, এটা হতে পারে ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস (Chronic Pancreatitis), এমন একটা রোগ যা আমাদের দেশে অল্প বয়সী, রোগা পাতলা মানুষদের মধ্যেও হয় (যেটা পশ্চিমা বিশ্বে এলকোহল খাওয়া লোকেদের বেশি হয়) যাদের জীবনে কখনো মদ খাওয়ার কোনো ইতিহাস নেই।
কিন্তু এটা নিশ্চিত হতে গ্যাস্ট্রিক বা পিত্তথলির যে টেস্টগুলো আমরা সচরাচর করাই সেসব টেস্টে ধরা পড়ে না। লাগে বিশেষ ইমেজিং, যেমন MRCP বা Endoscopic Ultrasound। সমস্যা হলো, এই টেস্টগুলো সারা দেশে মাত্র হাতে গোনা হাসপাতালে হয়, কারণ এগুলোর খরচ মোটামুটি বেশি ই, আর সবগুলোই ঢাকায়।
এই রোগীর জন্য এটা বিশাল একটা ধাক্কা। ঢাকায় গিয়ে থাকা, খরচ, ব্যবসার ক্ষতি সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়লো।
ঠিক তখন পরিচিত এক ফার্মেসির দোকানদার বললেন, "এত ঝামেলার দরকার নাই ভাই, এই ওষুধগুলো খেয়ে দেখেন।" একটা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, একটা ব্যথা কমানোর, আর পেট মোচড়ানোর ব্যথার ওষুধ মিলিয়ে একটা কম্বিনেশন দিলেন।
আশ্চর্যজনকভাবে কিছুদিনের মধ্যেই ব্যথা অনেকটা কমে এলো। উনি ভাবলেন, যাক সমস্যা মিটে গেছে। তার মনে তখন ডাক্তারের প্রতি একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলো। এত দামি দামি টেস্ট, এত জটিলতার কথা বলল এই ডাক্তার। অথচ এই সাধারণ ওষুধেই তো ভালো হয়ে গেলাম! শুধু কমিশন খাওয়ার ধান্দা। অথচ ওই ডাক্তারের চেম্বার অন্য জেলায়, দূরদূরান্ত পর্যন্ত কমিশনের কোনো সুযোগ নেই। পরিচিতজনদেরও বলে বেড়ালেন, নতুন ডাক্তাররা নাকি অযথা ভয় দেখায়।
আসলে ভেতরে ভেতরে যা হচ্ছিল, সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি।
ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটে। রোগ যত এগোয়, অগ্ন্যাশয়ের বা প্যানক্রিয়াস কোষ ধীরে ধীরে ধ্বংস (fibrosis) হতে থাকে, আর এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় ব্যথার অনুভূতিও কমে আসে। মানে ব্যথা কমে যাওয়া রোগ সেরে যাওয়ার প্রমাণ না। বরং অনেক সময় উল্টো, অঙ্গটা ধ্বংস হতে হতে অনুভূতিও নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। ফার্মেসির ওষুধ লক্ষণ কিছুটা চাপা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অগ্ন্যাশয়ের ভেতরের ক্ষতি কন্টিনিউয়াস হছিলো।
প্রায় দেড় বছর পর উমি খেয়াল করলেন হঠাৎ প্রচুর ওজন কমে যাচ্ছে, ঘন ঘন পানি তৃষ্ণা পাচ্ছে, বার বার প্রস্রাব হচ্ছে, আর পায়খানা ও কেমন তেলতেলে, দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
উপায় না পেয়ে আবার তিনি আবার সেই তরুণ ডাক্তারের কাছেই ফিরে গেলেন, আর এবার দেরি করলেন না। CT scan আর প্রয়োজনীয় টেস্ট করালেন। রিপোর্টে ধরা পড়লো। অগ্ন্যাশয়ে ক্যালসিফিকেশন (পাথর হয়ে গেছে), দীর্ঘদিনের ক্ষতির স্পষ্ট প্রমাণ। রক্তের সুগারও ডায়াবেটিসের মাত্রায়, কারণ ইনসুলিন তৈরির কোষগুলোও ততদিনে অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।
এখন তাকে সারাজীবনের জন্য ইনসুলিন আর হজমের এনজাইম সাপ্লিমেন্ট নিয়ে চলতে হবে, যা হয়তো দেড় বছর আগে সময়মতো ধরা পড়লে অনেকটাই প্রতিরোধ করা যেত।
আসলে আমাদের এখান থেকে অনেক কিছু শেখার এবং শেখানোর আছে।
- পেটের ব্যথা বার বার হলেই সেটা সবসময় "গ্যাস্ট্রিক" না। ওষুধে পুরোপুরি না কমলে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার।
- পিত্তথলি বা লিভারের টেস্ট নরমাল আসা মানে পেটের সব সমস্যা বাদ হয়ে যাওয়া না। অগ্ন্যাশয়ের মতো অঙ্গও পরীক্ষা করতে হতে পারে।
- নতুন পাশ করা ডাক্তার মানেই কম দক্ষ না। সাম্প্রতিক ট্রেনিং, আর পুরনো রিপোর্ট মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করার অভ্যাসই আসলে একজন ভালো চিকিৎসকের লক্ষণ।
- ফার্মেসির দোকানদার ডাক্তার নন। তার পরামর্শে সাময়িক আরাম পাওয়া মানেই রোগ সেরে যাওয়া না। অনেক সময় এটা রোগ শুধু চাপা দিয়ে রাখে।
- ব্যথা কমে যাওয়া ও সবসময় ভালো লক্ষণ না। কিছু ক্রনিক রোগে অঙ্গ যত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যথার অনুভূতিও তত কমে যেতে পারে।
- খরচ বা দূরত্বের কারণে জরুরি টেস্ট এড়িয়ে যাওয়ার আগে ডাক্তারের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করুন। বিকল্প অবশ্যই থাকতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক।
সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
~ শাহরিয়ার, এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ার।