18/07/2026
“সব সত্য কথা বলা সহজ নয়…!”
স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট হিসেবে আমাদের পেশাগত জীবনের অন্যতম কঠিন দায়িত্ব হলো এমন অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করা, যাদের সন্তানের অগ্রগতি (progress) তুলনামূলকভাবে ধীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিটি মা-বাবাই স্বাভাবিকভাবেই চান তাদের সন্তান দ্রুত উন্নতি করুক। কিন্তু ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন অনেক সময় ইঙ্গিত দেয় যে শিশুটির শেখার গতি ধীর হতে পারে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এমন বাস্তবতা জানানো কখনোই সহজ নয়।
তবে একজন পেশাদার থেরাপিস্টের ভূমিকা শুধু আশার কথা বলা নয়, আবার আশার আলো নিভিয়ে দেওয়াও নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো বৈজ্ঞানিক তথ্য, ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ এবং সহমর্মিতার সমন্বয়ে পরিবারকে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা (Realistic Expectations) গড়ে তুলতে সহায়তা করা। কারণ বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা হতাশা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ভিত্তি।
মনে রাখতে হবে, উন্নতি সবসময় বড় পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় একটি নতুন যোগাযোগের চেষ্টা, একটি নির্দেশনা অনুসরণ করা, যৌথ মনোযোগ (Joint Attention) বৃদ্ধি পাওয়া, একটি অর্থপূর্ণ ইশারা ব্যবহার করা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের একটি ছোট দক্ষতা অর্জনই ভবিষ্যতের বড় অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করে।
একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি শিশুর প্রতিদিনের পারফরম্যান্স একই রকম হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সে স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা (fluctuation) দেখা যায়। কোনো দিন সে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে, আবার অন্য দিন একই দক্ষতা প্রদর্শন নাও করতে পারে। এর পেছনে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, শারীরিক অসুস্থতা, ক্লান্তি, উদ্বেগ, সেন্সরি ওভারলোড, পরিবেশগত পরিবর্তন, মনোযোগ কিংবা মোটিভেশনের মতো বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে।
তাই একজন দক্ষ থেরাপিস্ট কখনো একটি দিনের পারফরম্যান্স দেখে শিশুর সামগ্রিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করেন না। বরং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন পরিবেশে শেখা দক্ষতার ব্যবহার (Generalization), কার্যকর যোগাযোগের সক্ষমতা, দৈনন্দিন জীবনে অংশগ্রহণ এবং শিশুর সামগ্রিক কার্যকরী দক্ষতার (Functional Outcomes) পরিবর্তনের ভিত্তিতেই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়।
এ কারণেই থেরাপির সফলতা কেবল “শিশুটি কত দ্রুত কথা বলছে”—এর মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়। বরং সে তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী কতটা কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারছে, সামাজিকভাবে কতটা অংশগ্রহণ করতে পারছে, কতটা স্বাধীনভাবে দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করতে পারছে এবং তার জীবনমান কতটা উন্নত হচ্ছে—এসবই অধিক অর্থবহ সূচক।
প্রিয় অভিভাবক, আপনার সন্তানের অগ্রগতিকে অন্য কোনো শিশুর সঙ্গে নয়, বরং তার নিজের গতকালের সঙ্গে তুলনা করুন। কোনো একটি দিন সে প্রত্যাশার চেয়ে কম পারফরম্যান্স দেখালে হতাশ হবেন না, আবার একটি খুব ভালো দিনের পারফরম্যান্স দেখে অবাস্তব প্রত্যাশাও তৈরি করবেন না। একটি দিনের সাফল্য বা সীমাবদ্ধতা নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক পরিবর্তনই শিশুর প্রকৃত অগ্রগতির পরিচায়ক।
শিশুর বিকাশ কোনো প্রতিযোগিতা নয়, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার দৌড়ও নয়। এটি একটি ধারাবাহিক শেখার যাত্রা, যেখানে প্রতিটি ছোট অর্জন ভবিষ্যতের বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। এই যাত্রায় বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা, প্রমাণভিত্তিক (Evidence-based) থেরাপি, ঘরে নিয়মিত অনুশীলন এবং পরিবার-থেরাপিস্টের পারস্পরিক সহযোগিতাই দীর্ঘমেয়াদে অর্থবহ ও টেকসই ফলাফল অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
🥰🇧🇩
মো: আব্দুর রহমান
ক্লিনিকাল স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট
চিফ কনসালট্যান্ট, ব্রেইন জিম বাংলাদেশ