18/09/2025
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি কি এবং এর প্রতিকার:
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হলো ডায়াবেটিসের একটি গুরুতর জটিলতা যা চোখের রেটিনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রেটিনা হলো চোখের পেছনের দিকে অবস্থিত একটি আলোক-সংবেদনশীল টিস্যু যা আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে এবং মস্তিষ্কে পাঠায়, যার ফলে আমরা দেখতে পাই। দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে এই রোগটি হয়। এটি অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির কারণ এবং ঝুঁকির কারণ
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির প্রধান কারণ হলো দীর্ঘকাল ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকা। এর পাশাপাশি আরও কিছু ঝুঁকির কারণ রয়েছে:
ডায়াবেটিসের সময়কাল: যত বেশি সময় ধরে একজন ব্যক্তি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকেন, রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি তত বেশি হয়।
দুর্বল রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: রক্তে শর্করার মাত্রা ক্রমাগত উচ্চ থাকলে রেটিনার রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন): উচ্চ রক্তচাপ রেটিনার ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
উচ্চ কোলেস্টেরল: উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা রক্তনালীগুলির ক্ষতিতে অবদান রাখতে পারে।
গর্ভাবস্থা: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলাদের রেটিনায় পরিবর্তন হতে পারে।
ধূমপান: ধূমপান রক্তনালীগুলির ক্ষতি করে এবং এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বয়স: বয়স্কদের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির ঝুঁকি বেশি থাকে।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির পর্যায়
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি সাধারণত দুটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত:
১. নন-প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (NPDR): এটি রোগের প্রাথমিক পর্যায়। এই পর্যায়ে রেটিনার ছোট রক্তনালীগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং স্ফীত হয় (Microaneurysms), যার ফলে রেটিনায় তরল পদার্থ এবং রক্তক্ষরণ হতে পারে। এই পর্যায়টি আবার তিনটি উপ-পর্যায়ে বিভক্ত হতে পারে:
হালকা (Mild) NPDR: শুধুমাত্র কিছু মাইক্রোঅ্যানিউরিজম দেখা যায়।
মাঝারি (Moderate) NPDR: রক্তনালীগুলি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে তরল এবং রক্ত রেটিনায় ছড়িয়ে পড়ে।
গুরুতর (Severe) NPDR: রেটিনার অনেক রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে রেটিনায় রক্ত সরবরাহ কমে যায়। এটি নতুন রক্তনালী বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়, যা রোগের পরবর্তী পর্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।
২. প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (PDR): এটি রোগের সবচেয়ে উন্নত এবং গুরুতর পর্যায়। এই পর্যায়ে রেটিনার অক্সিজেন ও রক্ত সরবরাহের অভাব পূরণের জন্য নতুন, অস্বাভাবিক এবং ভঙ্গুর রক্তনালী তৈরি হয়। এই নতুন রক্তনালীগুলো সহজেই ফেটে যেতে পারে, যার ফলে চোখের ভিতরে রক্তক্ষরণ (Vitreous Hemorrhage) হয়। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই পর্যায়ে রেটিনার টিস্যুর উপর দাগ (scar tissue) তৈরি হতে পারে, যা রেটিনাকে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে টেনে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে (Tractional Retinal Detachment), যা স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে রোগ অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে কিছু লক্ষণ দেখা যায়:
ঝাপসা বা বিকৃত দৃষ্টি।
দৃষ্টির ক্ষেত্রে ভাসমান দাগ বা কালো দাগ দেখা (Floaters)।
হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি হ্রাস।
রাতে দেখতে অসুবিধা।
রঙের পার্থক্য করতে অসুবিধা।
চোখে ব্যথা বা লালভাব।
রোগ নির্ণয়
রোগ নির্ণয়ের জন্য একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ (Ophthalmologist) বিস্তারিত চক্ষু পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
প্রসারিত চোখের পরীক্ষা (Dilated Eye Exam): চোখের ড্রপের মাধ্যমে পিউপিল বড় করে রেটিনার ক্ষতির লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়।
ফ্লুরেসসিন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি (Fluorescein Angiography): রক্তনালীর অবস্থা বোঝার জন্য এক ধরনের ডাই ইনজেকশন দিয়ে রেটিনার ছবি তোলা হয়।
অপটিক্যাল কোহেরেন্স টোমোগ্রাফি (OCT): রেটিনার ক্রস-সেকশনাল ছবি নিয়ে রেটিনার পুরুত্ব এবং ফোলা (edema) পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের পর্যায় এবং তীব্রতার উপর। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রেটিনার ক্ষতি কমানো এবং দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো রক্তে শর্করা, রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
লেজার চিকিৎসা (Laser Photocoagulation): এটি PDR-এর জন্য সবচেয়ে সাধারণ চিকিৎসা। এতে লেজার রশ্মি ব্যবহার করে নতুন, অস্বাভাবিক রক্তনালীগুলো ধ্বংস করা হয়, এবং রেটিনায় তরল নিঃসরণ বন্ধ করা হয়।
চোখে ইনজেকশন (Intravitreal Injections): চোখে অ্যান্টি-ভিইজিএফ (Anti-VEGF) ওষুধ ইনজেকশন দেওয়া হয় যা নতুন রক্তনালীর বৃদ্ধি রোধ করে এবং রেটিনার ফোলা কমায়।
ভিট্রেক্টমি (Vitrectomy): এটি একটি অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যা মারাত্মক PDR বা রেটিনা বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে চোখের ভিতরের জেল (Vitreous) এবং দাগযুক্ত টিস্যু অপসারণ করা হয়।
প্রতিরোধ
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
নিয়মিতভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা।
উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ধূমপান ত্যাগ করা।
ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর বছরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে চোখ পরীক্ষা করানো।