13/08/2026
JK এবং তার অনুসারীদের প্রতি কিছু খোলা নাসীহাহ
আমি ডা. মো. শরিফুল ইসলাম। ফিকহ অব মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করেছি লন্ডনের আল-বালাঘ একাডেমিতে। ফাউন্ডিং ডিরেক্টর, Research Academy for Medical Fiqh and Islamic Treatment-RAMFIT. এছাড়া হাদীস অফ মেডিসিন, ফিকহ অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড সাইকোলজি, ফিকহ অফ ইউনানী মেডিসিনের ওপরেও স্ট্রাকচারাল সিস্টেমটিক ওয়েতে আল বালাঘ একাডেমিতে উচ্চতর পড়াশোনা করেছি। পাশাপাশি সহীহ বুখারীর কিতাবুত ত্বিব চ্যাপ্টারের ওপর আমার ইজাযত রয়েছে।
র্যামফিট ২০২০ সাল থেকেই হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাজ করে চলছে। আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাগণ চিকিৎসার ব্যাপারে আমাদের কী ধরনের আকিদা ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে বলেছেন, চিকিৎসার নীতি ও দিকনির্দেশনা কী হওয়া উচিত, এবং সেই নির্দেশনার আলোকে আমরা কীভাবে আধুনিক মেডিকেল সায়েন্সকে শারীয়াহর সঙ্গে আরও অ্যালাইন করতে পারি, এসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিভিন্ন হাদীস এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে পরবর্তী যুগের তাবে-তাবেঈ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস এবং প্রখ্যাত ক্লাসিক্যাল ইসলামিক স্কলারগণ (যেমন ইমাম নববী, ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী, ইমাম গাযালী, ইমাম ফখর উদ্দিন আর-রাযী, ইবনে সিনা, ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ) চিকিৎসার একটি মৌলিক কাঠামো ও নিয়মনীতি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নতি সাধিত হয়েছে, তার সঙ্গে শারীয়াহর সম্পর্ক কী হবে এবং কীভাবে মেডিকেল সায়েন্সকে শারীয়াহর কাঠামোর ভেতরে রাখা যায়, এসব বিষয়ে তারা বিস্তর গবেষণা করেছেন। একইসঙ্গে এসব ব্যাপারে আমাদের আকিদা ও মনোভাব কেমন হওয়া উচিত, তারও বিস্তারিত গাইডলাইন দিয়ে গেছেন।
আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً
“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এমন কোনো অসুস্থতা দেননি, যার শিফা দেননি।” এছাড়া তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার সঙ্গে তার চিকিৎসাও অবতীর্ণ করেননি; যে তা জানে না, সে জানে না, আর যে জানে, সে জানে।”
এই হাদিসগুলোর ব্যাখ্যায় ইমাম নববী ও ইবনু হাজার আসকালানীসহ অন্যান্য স্কলারগণ বলেছেন, যুগে যুগে মানুষের জ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে এমন অনেক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হবে, যা পূর্বে মানুষের জানা ছিল না। আবার এমন চিকিৎসা পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হবে, যা একসময় অনেক কঠিন, দুষ্প্রাপ্য কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াপূর্ণ ছিল; সময়ের সঙ্গে তা আরও উন্নত ও রিফাইন্ড হবে এবং ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে। একইসঙ্গে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের জটিল এবং কমপ্লেক্স অসুস্থতা তৈরি হবে, যার চিকিৎসা পদ্ধতিও পরবর্তী সময়ে গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হবে। কেননা রোগ যতই জটিল হোক না কেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার চিকিৎসা পদ্ধতি দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন এবং মানুষ সময়ের সাথে তা আবিষ্কার করবে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর পর হেলথ এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে বিশাল একটা রেভোলিউশন ঘটে। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে এমন অনেক বিষয় নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হয়, যা পূর্বে সম্ভব ছিল না। আগে রোগ হওয়ার কারণ ও রোগ নির্ণয় সম্পর্কে বিভিন্ন প্রাচীন ও প্রাথমিক ধারণা ছিল। যেমন প্রাচীন গ্যালেন ও হিপোক্রেটিসের হিউমোরাল থিওরি (Humoral Theory), কিংবা মিয়াজমা থিওরি (Miasma Theory), যেখানে পচা বা দূষিত বাতাসকে মহামারীর মূল কারণ মনে করা হতো।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ও রবার্ট কখের হাত ধরে আসে জার্ম থিওরি (Germ Theory), যার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের অস্তিত্ব জানা যায়। বর্তমানে আমরা সেই জার্ম থিওরি পার হয়ে ডিজিজ থিওরি থেকে মানুষের পরিপাকতন্ত্র ও শরীরের অণুজীবের ভারসাম্যভিত্তিক মাইক্রোবায়োম থিওরি (Microbiome Theory) পর্যন্ত অনেক বিস্তারিতভাবে জানতে পারছি। কোনো রোগ কেন হয়, কীভাবে হয়, এসব আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে এবং নির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এ কারণে দেখা যায়, পূর্বে যেরকম ডায়রিয়া, চিকেনপক্স, কলেরায় বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যেত, বর্তমানে হিস্টোরিক্যাল ডেটা দেখলে বোঝা যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিতে সেই মৃত্যুহার লক্ষণীয়ভাবে কমে এসেছে।
কিন্তু এটাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই চিকিৎসাব্যবস্থাকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ করেছে এবং তাদের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কীভাবে সর্বোচ্চ প্রফিট করা যায়। তাই যদি কোনো মেডিসিন এমন হয়, যা খুব কম সময়ে কোনো রোগকে কার্যকরভাবে নিরাময় করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন কমিয়ে দেয়, তাহলে অনেক সময় সেই ওষুধের পরিবর্তে নতুন কোনো ট্রিটমেন্ট বা মেডিসিন তৈরি ও বাজারজাত করার দিকে বাণিজ্যিক আগ্রহ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এমন রিসার্চও কন্টিনিউ করা হয়, যেখানে মূল সমস্যার একটি রেমেডি তৈরি হলেও তার সাইড ইফেক্টস থেকে যায়। সেই সাইড ইফেক্ট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আবার নতুন ওষুধের প্রয়োজন হয়। এতে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা আরও ফ্লারিশ করতে থাকে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান মডার্ন মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, ফার্মাকোথেরাপি এবং মেডিকেল প্রসিডিউরের বেনিফিট, কার্যকারিতা ও গবেষণাকে আমরা পুরোপুরি অস্বীকার করব। যেকোনো একটি বিষয়ের উপকারিতা বা ক্ষতি অনেকাংশে নির্ভর করে, যে ব্যক্তি বা যারা সেটাকে পরিচালনা করছে, তারা সেটা কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর। মডার্ন মেডিকেল টেকনোলজি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে অন্যতম বড় নিয়ামত। কিন্তু এই নিয়ামতকে ঘিরে ফার্মাসিউটিক্যাল কর্পোরেট মাফিয়ার বাণিজ্যিক স্বার্থ যে প্রভাব বিস্তার করছে, এটাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
র্যামফিট এবং ইয়াশফীন তাদের কার্যক্রমের শুরু থেকেই মডার্ন মেডিকেল সায়েন্স এবং প্রফেটিক ও ক্লাসিক্যাল শারীয়াহ গাইডলাইনের সমন্বয়ের পাশাপাশি কর্পোরেট ফার্মাসিউটিক্যালসের অতিরিক্ত কমার্শিয়ালাইজেশন, তাদের পলিসি এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি অল্টারনেটিভ সিস্টেম ডেভেলপ করার জন্য কাজ করছে। ইতিমধ্যে আমরা এই সেক্টরে রিসার্চ-বেজড কিছু কাজ করছি, যার নাম ‘দ্যা গ্রিনিং অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। এখানে মূল ফোকাস হচ্ছে, বর্তমানে যে অ্যালোপ্যাথিক ট্রিটমেন্ট প্রসিডিউর রয়েছে, তার সমান্তরালে এমন একটি সিস্টেম ডেভেলপ করা, যেখানে প্রাকৃতিক বিভিন্ন বিষয় ও উপাদানকে মডার্ন টেকনোলজির মাধ্যমে আমরা ওষুধে কনভার্ট করতে পারব।
এখানে সবচেয়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো যে ড্রাগস তৈরি করে, তার মেজোরিটিই কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের মেডিসিনাল প্রপার্টিজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। যেমন ওপিয়াম, ওপিওয়েড, মরফিন, এসব তৈরি হচ্ছে পপি সিড থেকে। অর্থাৎ ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগসের একটি বড় অংশের মূল উৎসই কোনো না কোনো ন্যাচারাল সোর্স।
কিন্তু বর্তমান সময়ে আট বিলিয়ন মানুষের জন্য শুধু ভেষজ উপাদান থেকে সাস্টেইনেবল ওষুধ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। কারণ ভেষজ উপাদান থেকে সাস্টেইনেবলভাবে ওষুধ তৈরির জন্য যে পরিমাণ জায়গাজুড়ে কমার্শিয়াল কাল্টিভেশন প্রয়োজন এবং সেই পরিমাণ গাছ থেকে যে পরিমাণ মেডিসিনাল কম্পোনেন্ট পাওয়া যায়, তা দিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। ব্যাক ইন সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরি, যখন ওষুধ প্রদানের মৌলিক উৎস ছিল ভেষজ উপাদান, তখনকার পরিস্থিতি যদি আমরা দেখি, লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে কেবল রিসোর্স বা ওষুধের স্বল্পতার কারণে।
বিজ্ঞানীরা এই স্বল্পতা কাটাতে কৃত্রিম ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে যান। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ইনসুলিন। আগে ইনসুলিন তৈরি করা হতো শুকরের প্যানক্রিয়াস থেকে, এরপর গরুর প্যানক্রিয়াস থেকে। কিন্তু বর্তমানে যে পরিমাণ ইনসুলিন প্রয়োজন, তা যদি আমরা শুধু প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করতে চাইতাম, তবে প্রয়োজনের পাঁচ ভাগের এক ভাগও পূরণ করা সম্ভব হতো না। ফলে রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ টেকনোলজি আবিষ্কার করা হল, যার মাধ্যমে মানুষের ইনসুলিনের মতো একইরকম ইনসুলিন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
সুতরাং ড্রাগ ইন্ডাস্ট্রির বিজনেস পলিসি নিয়ে সমালোচনা থাকা এক কথা, কিন্তু তাদের ট্রিটমেন্ট প্রসিডিউর বা ন্যাশনাল গাইডলাইনের সবকিছুই মানুষকে বোকা বানিয়ে চিরকালের জন্য অসুস্থ বানিয়ে রাখার চক্রান্ত, এই ধরনের বক্তব্য কার্যকরভাবে ভুল। কারণ এসব মেডিকেল বিষয় নিয়ে মক্কা, জেদ্দা, কুয়েত ও ইউরোপের ফিকহ একাডেমিগুলো সম্মিলিতভাবে ফাতওয়া ও গাইডলাইন প্রদান করছে এবং ১৯৬০ সাল থেকে শত শত মুফতি ও ডাক্তার সমন্বিতভাবে এই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শারীয়াহর দৃষ্টিতে কোনো ওষুধ, অপারেশন, ভেষজ বা প্রযুক্তিকে ‘চিকিৎসা’ হিসেবে গ্রহণ করার মানদণ্ড কী? ক্লাসিক্যাল উলামাদের আলোচনায় এর একটি সুস্পষ্ট ফিকহি কাঠামো পাওয়া যায়:
১. ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ (التجربة):
হাফিয ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে কিতাবুত তিব্ব-এর শুরুতেই বলেছেন:
وَأَمَّا طِبُّ الْجَسَدِ، فَمِنْهُ مَا جَاءَ فِي الْمَنْقُولِ عَنْهُ، وَمِنْهُ مَا جَاءَ عَنْ غَيْرِهِ، وَغَالِبُهُ رَاجِعٌ إِلَى التَّجْرِبَةِ.
অর্থাৎ শারীরিক চিকিৎসার কিছু এসেছে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে, কিছু অন্যদের থেকে; তবে এর অধিকাংশই ফিরে যায় তাজরিবা তথা অভিজ্ঞতার দিকে (ফাতহুল বারী ১০/১৩৪)। কোনো ওষুধের নাম সরাসরি নসে থাকা শর্ত নয়; সেটি বাস্তবে উপকার করে কি না, তা নির্ণয় করবে চিকিৎসাবিদ্যার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। তবে মনে রাখতে হবে, ‘তাজরিবা’ মানে কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়। “অমুকে খেয়ে ভালো হয়েছে”, এই একটি ঘটনা দিয়ে কোনো চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয় না।
ইমাম ইবনু হাজার আসকালানীর মতে, কোনো চিকিৎসাপদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাজরিবা বা পরীক্ষালব্ধ অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি। আর এর কার্যকরী প্রভাবও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
২. উপকারের প্রবল সম্ভাবনা (غلبة الظن): ইমাম নববী রওদাতুত তালিবীনে বলেছেন:
ثُمَّ إِنْ كَانَتِ الْمُدَاوَاةُ مِمَّا يُرْجَى نَفْعُهُ وَيُؤْمَنُ ضَرَرُهُ، فَذَاكَ
অর্থাৎ চিকিৎসাটি যদি এমন হয় যার উপকার প্রত্যাশিত এবং ক্ষতি থেকে নিরাপত্তা আশা করা যায়, তবে তা গ্রহণযোগ্য (রওদাতুত তালিবীন ৪/৯৪)।
আল্লামা ইবনু আবিদীন স্পষ্ট করে বলেন:
وَالظَّاهِرُ أَنَّ التَّجْرِبَةَ يَحْصُلُ بِهَا غَلَبَةُ الظَّنِّ دُونَ الْيَقِينِ
(রদ্দুল মুহতার ১/২১০)। অর্থাৎ তাজরিবা দ্বারা সাধারণত গালাবাতুয যন অর্জিত হয়, ইয়াকিন নয়।
৩. রোগের সঙ্গে চিকিৎসার সংগতি: ইবনু হাজার বলেন:
وَالطَّرِيقُ إِلَى مَعْرِفَتِهِ بِتَحَقُّقِ السَّبَبِ وَالْعَلَامَةِ
কোনো একটি রোগের ক্ষেত্রে নিরাময়ের প্রভাব দেখা গেলেই সেটিকে সর্বজনীন চিকিৎসা বলা যায় না। কোনো ভেষজের প্রদাহনাশক গুণ পাওয়া গেলেই তা দিয়ে ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব কিংবা সবকিছুর চিকিৎসা করা সম্ভব, এমনটা বলা যায় না।
৪. নিরাপত্তা ও বৃহত্তর কল্যাণ: ইমাম ইজ্জ ইবন আবদুস সালাম ‘কাওয়াইদুল আহকাম’-এ জীবন রক্ষার প্রয়োজনে পচনধরা হাত কেটে ফেলার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন:
تَحْصِيلِ الْمَصْلَحَةِ الرَّاجِحَةِ
“অধিকতর কল্যাণ অর্জন” (কাওয়াইদুল আহকাম, ২/৯২)।
অর্থাৎ, চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঝুঁকির তুলনায় উপকার ও নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা যখন বেশি থাকে, তখনই সেই চিকিৎসার যৌক্তিকতা তৈরি হয়।
বর্তমান সময়ে র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল বা এভিডেন্স-বেজড মেডিসিনের যে স্ট্রাকচার ডেভেলপ হয়েছে, তা মূলত ক্লাসিক্যাল স্কলারদের উল্লেখিত এই মৌলিক মানদণ্ডগুলোকেই বৈজ্ঞানিক রূপ দিয়েছে, যার মূল ভিত্তি আমাদের ইসলামিক স্কলারদের বিমারিস্তান-ভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যেই বিদ্যমান ছিল।
আমার এই বক্তব্যের ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের কিছু বক্তব্য ও বিষয়কে কেন্দ্র করে। তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যায়ামের কথা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষগণ যেমন শারীরিক শ্রম করেছেন, লাইফস্টাইল মডিফিকেশন, প্রিভেনশন ইত্যাদি নিয়ে বলেন। এগুলো আলহামদুলিল্লাহ অবশ্যই সুন্দর পরামর্শ, যাতে মানুষ উপকৃত হতে পারে। ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের মাধ্যমে সমস্ত মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে এবং কেউই উপকৃত হচ্ছে না, এ ধরনের বক্তব্য আমি দিচ্ছি না। কিন্তু তিনি মেডিকেল সায়েন্সের কিছু এস্টাবলিশড থিওরিকে এমনভাবে মিসইন্টারপ্রেট করছেন, যা গবেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
বিষয়টা এমন নয় যে, ইয়া/হু/দী-খ্রিস্টান মেডিকেল সায়েন্স পড়ে এসেছে বলে আমাদের ডাক্তার সোসাইটির সবাই ব্রেইনওয়াশড হয়ে গেছে, ফলে তারা তার থিওরি মেনে নিতে পারছে না।
আমাদের ডাক্তার সোসাইটিতে ঈমান, আমল ও আকীদার দিক থেকে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের চেয়েও অনেক বেশি বলীয়ান অনেক ডাক্তার আছেন। তাদের কেউ হয়তো তাবলীগে মেহনত করছেন, কেউ হয়তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামের ওপর পড়াশোনা করছেন, অথবা আলেম-উলামার সোহবতে থেকে ক্লাসিক্যাল ওয়েতে ইসলামের ওপর জ্ঞান অর্জন করছেন। এরকম শত শত ডাক্তারের কাছেই তার থিওরি অগ্রহণযোগ্য। কারণ তিনি মনমতো ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, যার বেশিরভাগেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের কনভেনশনাল ডাক্তারদের ঘাটতি ও দুর্বলতাগুলো অস্বীকার করছি। আমরা স্বীকার করি, যে পরিমাণ সময় রোগীকে দেওয়া দরকার, সে পরিমাণ সময় রোগীকে দেওয়া হয় না। অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দেওয়া হয়, অপ্রয়োজনীয় অপারেশন করা হয়, অথবা চিকিৎসার ক্ষেত্রে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেগুলো প্রত্যেকটা নিজ নিজ ক্ষেত্রে শারীয়াহর দৃষ্টিতে অমার্জনীয় গুনাহ, যার জন্য তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
এছাড়া আমাদের দেশে রোগীর তুলনায় ডাক্তারের অপ্রতুলতা, সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রচণ্ড চাপ এবং রেফারেল সিস্টেম না থাকার কারণে একজন ডাক্তারকে দিনে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী দেখতে হয়। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোগীকে যথেষ্ট সময় দেওয়া, কাউন্সেলিং করা এবং লাইফস্টাইল নিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না।
একইভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় লাইফস্টাইল মডিফিকেশন-এরও একটা বড় সামাজিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ডায়াবেটিস বা হাইপারটেনশনের ক্ষেত্রে তিনটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ: Discipline, Diet and Drug। কিন্তু ঢাকাতেই প্রায় ৩ কোটির ওপর লোক বাস করে। প্রতিদিন সকাল ৭টায় উঠে বিপুল পরিমাণ মানুষকে অফিসের জন্য ছুটতে হচ্ছে, সারাদিন কাজ করে রাত ৮টায় বাসায় ফিরতে হচ্ছে। এই অর্থনীতির যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লাইফস্টাইল মডিফিকেশন বা ডায়েটের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
সুতরাং আমাদের মূল কাজ হওয়া উচিত এই হেলথ ইনফ্রস্ট্রাচারকে ঢেলে সাজানোর জন্য কাজ করা। কীভাবে ডাক্তার ও রোগীর অনুপাতের সমস্যা দূর করা যায়, কীভাবে রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যায়, কীভাবে লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, সেদিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল থিওরিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি এসব মৌলিক সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হয়, তাহলে চটকদার বক্তব্য ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা থেকেই যায়।
এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ডা. জাহাঙ্গীর কবির একজন পাবলিক ফিগার। তার মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া কোনো ভুল মেডিকেল থিওরি জনপরিসরে প্রচণ্ড রকমের ক্ষতির সম্ভাবনা রাখে। ফিকহের কাওয়াইদের অন্যতম একটি মূলনীতি হচ্ছে, ক্ষতি দূর করতে হবে। ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এমন পথও বন্ধ করতে হবে।
এখানে ডা. জাহাঙ্গীর কবির বা তার অনুসারীরা প্রায়ই একটি যুক্তি উপস্থাপন করেন। যারা সরাসরি ওনার চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তারা তো উপকৃত হচ্ছেন এবং সুস্থ থাকছেন। আর যারা ফেসবুক বা ইউটিউবে ওনার ভিডিও দেখে নিজে নিজে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কিংবা যাদের শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে, এই দায় ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নয়।
কিন্তু শারীয়াহ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান, কোনো দৃষ্টিতেই এভাবে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি যখন একজন ডাক্তার হিসেবে উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে চিকিৎসাগত বক্তব্য দেন, তখন তার বক্তব্য মাস লেভেলে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। ওনার কথা শুনে হাজার হাজার মানুষ প্রেসারের ওষুধ, ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করে দিচ্ছেন। অথচ ভিডিওতে যে রোগীর কন্ডিশন তুলে ধরা হয় আর ঘরে বসে ভিডিও দেখা সাধারণ রোগীর ক্লিনিক্যাল কন্ডিশন কাছাকাছি হলেও পুরোপুরি এক নয়। সামান্য একটি ক্লিনিক্যাল পার্থক্যের কারণেই রোগীর জীবনের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি নেমে আসতে পারে।
আপনি যখন উন্মুক্ত মাধ্যমে চিকিৎসাগত পরামর্শ দেবেন, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ ওষুধ বন্ধ করে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, যার ভুরি ভুরি প্রমাণ হাসপাতালে রয়েছে, তখন সেটির দায়ভার আপনার ওপর বর্তাবেই। শারীয়াহর অন্যতম প্রধান নীতি হলো সর্বসাধারণের সম্ভাব্য ক্ষতির পথ বন্ধ করা (সদ্দে যারায়ি।)
এর পাশাপাশি তিনি JK Lifestyle ও Health Revolution-এর মাধ্যমে হাই প্রাইসে বিভিন্ন প্রোডাক্ট বিক্রি ও মার্কেটিং করছেন যার বেশিরভাগের কোনো স্বীকৃত প্রমাণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে-এ প্রমাণিত নয়। এসব চিকিৎসা কেবল অ্যালোপ্যাথিতে নয়, বরং ন্যাচারোপ্যাথির ক্ষেত্রেও স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে উত্তীর্ণ হয় না।
চিকিৎসা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সময়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জেনারেল হেলথ এজুকেশন মাস পর্যায়ে দেওয়া এক কথা, কিন্তু সরাসরি যখন কোনো অসুস্থতা তৈরি হয়েছে, তখন কারো ভিডিও দেখে নিজের অথবা অপরের চিকিৎসা দেওয়া শারীয়াহর দৃষ্টিতে সঠিক অ্যাপ্রোচ নয়।
শারীয়াহর আরেকটা মৌলিক বিষয় হচ্ছে, যখন দুইটা চিকিৎসাপদ্ধতির একটি প্রমাণিত আর একটি অপ্রমাণিত, তখন শুধু একজনের ওপর কোনো চিকিৎসা কাজ করেছে বলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে অন্য ব্যক্তির ওপরও একইভাবে কাজ করবে। একই চিকিৎসার একেকজনের ওপর একেক রকম ইফেক্ট হতে পারে। এই বিষয়টি ফিকহের ৪টি স্তরের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়:
▪️ইয়াকিন (১০০% নিশ্চয়তা):
১০০% নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা যাবে যে, এই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই রোগে, এই সময়ে, এইভাবে ইফেক্ট হয়েছে, তাই অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একইভাবে ইফেক্ট হবে। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে ১০০ জনের ক্ষেত্রেই একই ইফেক্ট হবে। এটাকে বলা হয় ইয়াকিন।
▪️জন্নে গালেব (৭০% থেকে ৮৫%):
১০০ জনের মধ্যে ৭০ থেকে ৮৫ জনের ওপর ইফেক্ট পড়বে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য বর্তমান সময়ের এভিডেন্স-বেজড মেডিসিনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এই পর্যায়ের সম্ভাব্যতা।
▪️শাক্ব (৫০%-এর নিচে):
সম্ভাবনা ৫০%-এর নিচে নেমে গেলে কাজ হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় শাক্ব।
▪️ওয়াহম (২৫%-এর মতো):
কার্যকারিতার সম্ভাবনা যখন ২৫% বা তারও নিচে নেমে আসে, তখন সেটিকে বলা হয় ওয়াহম।
হোমিওপ্যাথি বা ন্যাচারোপ্যাথিতে ১০০ জনের মধ্যে ২০ থেকে ২২ শতাংশের মতো কাজ করে বলে দাবি করা হয়, যা চিকিৎসাগত দিক থেকে অনেক বড় ঘাটতি। ক্লাসিক্যাল উলামা এবং বিভিন্ন ফিকহ একাডেমি একে বিভ্রান্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেসব পদ্ধতির স্বীকৃত কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নেই, এই বিষয়ের উপকারিতা কীভাবে, কোন ওয়েতে, আমাদের শরীরের কোন অংশে, কোন মেকানিজমে কোনটার এগেইনস্টে কাজ করে উপকারে আসছে, সেটারও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আপনি যদি মনে করেন, যেকোনো জায়গা থেকে একটা রিসার্চ পেপারের মতো পেপার এনে সাবমিট করলেই সেটা ভ্যালিড রিসার্চ হয়ে যায়, তাহলে সেটা ঠিক নয়। ভ্যালিড রিসার্চ হতে হলে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নির্ধারিত প্রটোকলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এসমস্ত বিষয় নিয়ে ডাক্তার, আলেম-উলামাগণ এবং মেডিকেল ফিকহের স্টুডেন্টদের দিক থেকে আরও অনেক গবেষণা হওয়া দরকার। চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু একজনের ওপর কোনো একটি পদ্ধতি কাজ করেছে, এটাকে এভিডেন্স বলা যাবে না। সেটাকে তাজরিবার একটি যথাযথ কাঠামোর মধ্য দিয়ে যেতে হবে, এবং সেই অভিজ্ঞতাকে স্ট্রাকচারাল ও এভিডেন্স-বেজড প্রটোকলের মধ্যে আনতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা করা সম্ভব না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সামনে সেটাকে এস্টাবলিশড ট্রিটমেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করা, তার প্রচার ও প্রসার করা এবং গণহারে ওষুধ বন্ধ করতে বলা শারীয়াহ ও চিকিৎসাবিজ্ঞান কোনো দৃষ্টিতেই উপযুক্ত নয়।