16/12/2025
✨ সিজারিয়ান অপারেশন সেলাইয়ের স্থানে ইনফেকশন: কারণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
👩⚕️ সিজারিয়ান সেকশন বা সি-সেকশন হলো একটি অপারেশন (অস্ত্রোপচার), যা মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন হতে পারে। তবে যেকোনো অপারেশনের মতোই এর কিছু ঝুঁকি থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সেলাইয়ের স্থানে ইনফেকশন। এটি মায়ের জন্য শারীরিক কষ্ট, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
📊 বাংলাদেশে আক্রান্ত হওয়ার হার
একটি বেসরকারী জরিপে দেখা গেছে যে, আমাদের দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের পর প্রায় ১০–২৫% রোগীর সেলাইয়ে ইনফেকশন দেখা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মতে এই হার উদ্বেগজনক।
❓ কোন রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়?
কিছু বিশেষ কারণ সিজারিয়ান সেলাইয়ের স্থানে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনার ঝুঁকি আর বাড়ায়:
🩸 রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম: পুষ্টিহীনতার কারণে অনেক মায়ের শরীর সংক্রমণ প্রতিরোধে দুর্বল থাকে। যেমন—গর্ভাবস্থায় হেমোগ্লোবিন কম থাকা, রোগীর ওজন কম থাকা।
🩺 পূর্ববর্তী রোগ: ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
🧹 অপরিষ্কার পরিবেশ: হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিষ্কার না হলে, কিংবা যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত না থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়।
⚖️ অতিরিক্ত ওজন: স্থূলতায় আক্রান্ত মায়েদের ক্ষেত্রে ইনফেকশন বেশি হয়।
🤧 সিজারিয়ানের পর কাশি বা কোষ্ঠকাঠিন্য: এতে পেটে চাপ পড়ে, সেলাইয়ের স্থানে টান লাগে এবং ইনফেকশনের সম্ভাবনা বাড়ে।
🚫 ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব: যারা পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন নন, তাদের ঝুঁকি বেশি।
🦠 ইনফেকশনের প্রধান কারণ
অপারেশনের সময় জীবাণুর প্রবেশ: অপারেশনের সময় বা পরে ক্ষতে জীবাণু প্রবেশ পড়া। সাধারণত নিম্নমানের ক্লিনিকে কম খরচে অপারেশন করালে এ ঘটনা বেশি ঘটে। এ ক্ষেত্রে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রোগীর প্রতি যত্নশীল হয় না এবং যন্ত্রপাতি ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত করে না।
অপর্যাপ্ত পরিচর্যা: ক্ষত ভিজে থাকা বা সঠিকভাবে যত্ন না নেওয়া।
অস্ত্রোপচারগত ভুল: এ ধরনের ঘটনাও সাধারণত নিম্নমানের ক্লিনিকে বেশি দেখা যায়। ত্রুটিপূর্ণ সেলাই, জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ না করা ইত্যাদি। কখনো কখনো দেখা যায়, ডাক্তারের পরিবর্তে ওটি সহকারী সেলাই করেন, এর ফলে সমস্যা বাড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ক্লিনিক রোগীর প্রতি দোষারোপ করে যে রোগী নোংরা, তাই ইনফেকশন হয়েছে।
অপর্যাপ্ত ওষুধ: সিজারিয়ানের পরপর যে মানের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া দরকার তা না দেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, অপারেশন ঔষধসহ চুক্তিতে করা হয়। ফলে খরচ বাঁচাতে প্রথম তিন–চার দিন পর্যাপ্ত ও সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না। পরে রোগীর প্রতি দোষারোপ করা হয়, যে রোগী অপরিস্কার তাই ইনফেকশন হয়েছে।
অপারেশনের পর জীবাণুর প্রবেশ: ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাবে ক্ষতস্থানে নবজাতকের মল-মূত্র, বুকের দুধ বা অন্য কিছু লেগে গেলে ইনফেকশন হতে পারে।
🛡️ প্রতিরোধের উপায়
👩🍼 ব্যক্তিগত যত্ন
সিজারের সেলাইয়ের স্থান সবসময় পরিষ্কার ও শুকনা রাখুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
প্রথম কয়েক মাস ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন। প্রথম ৪ সপ্তাহ টিউবওয়েল চাপা থেকে বিরত থাকুন। ভারী বস্তু তুলবেন না (যা উঠাতে গেলে পেটে চাপ অনুভব হয়)।
কাশি, কোষ্ঠকাঠিন্য, সেলাইয়ের স্থানে চুলকানি হলে দ্রুত চিকিৎসা করান।
প্রচুর পানি পান করুন এবং সুষম খাবার খান। পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন। প্রতিদিন একটি লেবু খান, অন্তত এক মাস।
স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে ৬ ঘণ্টা পরপর পরিবর্তন করুন। সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করবেন না।
প্রতিদিন অন্তত তিনবার পরিধেয় বস্ত্র পরিবর্তন করুন—
(ক) সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর
(খ) দুপুরে
(গ) রাতে শোবার আগে বস্ত্র পরিবর্তনের পর পরিধেয় বস্ত্র ডিটারজেন্ট/সাবান দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে পরিস্কার করুন।
সিজারের সেলাই স্থানে শিশুর মল-মূত্র, মায়ের বুকের দুধ বা অন্য কিছু লাগতে দেবেন না।
হাত পরিষ্কার না করে সেলাইয়ের স্থানে স্পর্শ করবেন না।
গোসল করলে শরীর ও ক্ষতস্থান ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে, যাতে কাপড় ভিজে না যায়। কাপড় ভেজা থাকলে তা ক্ষতস্থানের সংস্পর্শে এসে ইনফেকশন সৃষ্টি করতে পারে।
🩺 চিকিৎসা পরামর্শ
সবসময় ভাল মানের ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশন করান।
সম্ভব হলে ঔষধ নিজের মধ্যে রাখুন (ঔষধসহ চুক্তি না দেয়া)।
চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী নিয়মিত ক্ষতস্থানের যত্ন নিন (যেমন—ড্রেসিং করুন)।
ডাক্তার যে ওষুধ দেন তা ঠিকমতো সেবন করুন। সঠিক নিয়মে ক্ষতস্থানে মলম ব্যবহার করুন।
ক্ষতের চারপাশে ফোলা, রস পড়া, ভেজাভাব, ফাঁটল, চুলকানি, স্থায়ী ব্যথা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
🏥 হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ
অপারেশন কক্ষ ও রোগীর থাকার স্থান জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।
অপারেশন থিয়েটারে দক্ষ লোকবল থাকতে হবে।
সব যন্ত্রপাতি ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
সঠিক এন্টিবায়োটিক পর্যাপ্ত পরিমানে দিতে হবে।
⚠️ সিজারিয়ান সেলাইয়ের স্থানে ইনফেকশন একটি গুরুতর সমস্যা। তবে সঠিক যত্ন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
✍️ স্বাস্থ্য সচেতনতায় আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম
প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক: বাংলাদেশ মেডিকেল ইন্সটিটিউট
প্রাক্তন জুনিয়র কনসালট্যান্ট: গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল, ঢাকা
চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক শতাধিক পুস্তকের রচয়িতা
চিকিৎসা - স্বাস্থ্য – পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, ন্যাচারাল মেডিসিন, লাইফস্টাইল পরামর্শক
📍 চেম্বার: সুপার প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, কলেজ মোড়, শেরপুর টাউন, শেরপুর।