28/04/2026
ছোটো ছোটো বাচ্চারা মারা গেলে কোথায় যায় ? জানি না। কালকে Preterm e Low birth weight e Shock এ একটা বাচ্চা মারা গেলো।
"স্যার,আমাদের বাচ্চাটাকে কি বাঁচবে?"
পাশাপাশি শুয়ে থাকা দুটো বাচ্চাই মৃত্যুর কাছাকাছি। একজন বাচ্চার নানি প্রশ্নটা করলেন।সিলেটের একটানা বৃষ্টির রাত।হয়তো দুজনেই মারা যাবে। কেউ আগে কেউ পরে- এটুকু জেনে মনের মধ্যে একবার প্রশ্ন জাগলো বাচ্চারা মারা গেলে,কোথায় যায় ?
বাচ্চার নানিকে কোনো ভালো উত্তর দিতে পারলাম না।বললাম,আইসিইউ ছাড়া যেকোনো মূহূর্তে বাচ্চা মারা যেতে পারে।চিন্তা করে দেখেন,বাইরে নিতে পারবেন কিনা।
অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলো মহিলাটা।বললো,'না,বাবা সামর্থ্য নাই।মরলে এইখানেই মরবে।তার মাও এই হাসপাতালে ভর্তি।'
চোখের সামনে বাচ্চাটা মরে গেলো।ধীরে ধীরে।শরীর গরম থেকে ঠান্ডা হতে অনেক সময় লাগলো।সময় নিয়ে মৃত্যুর কিছুটা পরও অপেক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত করলাম।
পাশের বাচ্চাটা ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে আইসিইউ সাপোর্টো চলে গেলো।এপাশ থেকে নানা নানিকে নিয়ে বাচ্চাটার মৃত্যুর অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার থাকলো না।একবার বাবা এলেন।দেখলেন ।ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন।
মৃত্যু নিশ্চিত করে জানানোর পরই ব্যাপারটা হলো।মহিলাটা আমাকে বারবার বললেন,'স্যার রাইত হয়ে গেছে।যে টানা বৃষ্টি শুরু হইছে কেমনে যাবো?অনেক দূর বাড়ি।ধিরাই।রাইতটা থাকি কোনোভাবে?'
পেডিয়াট্রিক্সে পা ফেলার জায়গাটুকু নেই।তার উপর মৃত বাচ্চা নিয়ে কে দিবে তাকে সারারাত থাকতে?
বৃদ্ধা খুঁজতে বের হলেন - তার মেয়ের জামাইকে। তার কাঁধে দুটো কাজ; তার নাতি আর বেঁচে নেই এটা মেয়ের স্বামীকে জানানো ,এই রাতেই কিভাবে বাড়ি ফিরবেন এতো রাতে এতোদূর মৃতবাচ্চা নিয়ে,টানা বৃষ্টিতে - তার সমাধান করা।বড় কঠিন হয়ে ওঠলো ব্যাপারটা।
মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে- বৃদ্ধা জানতে চাইলেন,শেষবার মাকে দেখানো যায় না বাচ্চাটাকে ?
আমি শক্ত গলায় বললাম, "না।"
অক্সিজেন সরিয়ে মায়ের কাছে নিয়ে গেলে নিতে নিতেই বাচ্চা মারা যেতো।আরো আগে। কি নির্মম একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো- জীবিত অবস্থায় হসপিটালে মা দেখতে পেলেন না তার বাচ্চাকে শেষবার ;বাঁচবে না জেনেও - ভেবে অদ্ভুত লাগে।
ভাবি না। এসব ভাবা আমার কাজ না।এতো ভাবলে- বসে পড়তে হবে। কাজ আর টানা করে যেতে পারবো না কখনো।
তবু - এপ্রোনটা খুলে রাতে নিশ্চিন্ত অবসরে- এইসব রোগী তার আত্মীয়টা মনের মধ্যে উঁকি দেয়। তারা দেখে কি কঠিন গলায় আমি 'না' বলি। কি কঠিন গলায় মৃত্যু ঘোষণা করি। নিশ্চয় বাড়ি গিয়ে বলেন, কি নির্দয় ডাক্তারটা। আমিও ভাবি, কি করে মনটা এতো বদলে গেলো আমার- যে আজকাল খুব একটা মৃত্যুও স্পর্শ করে না আমায়।
Dr. Sumon
২৮শে এপ্রিল,২০২৬ • সিলেট।