07/06/2026
"ডাক্তারি কোনো সেবা নয়, এটা আমাদের পেশা। আমি ফ্রি তে চিকিৎসা করে দিলে সেটা আমার মহৎ গুণ, আপনার অধিকার নয়"
চলমান সময়ে ডাক্তারদের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিতেও বহু সাধারন মানুষের কটুক্তি দেখে এই লিখাটি না লিখে পারলাম না।
একজন ডাক্তার তার জীবনের ৫ বছর বহুকষ্টে পড়াশোনা করে ডাক্তার হওয়ার পদবি অর্জন করে। এই ৫ বছর ধর্মচর্চা, বিয়ে-শাদী, আত্মীয়তা, মা-বাবার খেয়াল, কোনো কিছুরই হক্ব ঠিকভাবে আদায় করা সম্ভব হয় না। আপনার নন-মেডিকেল বন্ধুরা ঘুরতে যাবে, আত্মীয়-স্বজন বিয়ে খেতে যাবে, আপনি ছুটি পাবেন না। পেলেও খুবই কম পাবেন সাথে পড়ার প্রেশারও থাকবে। আলটিমেটলি আপনি সবার মত হয়ে থাকতে পারবেন না। আপনাকে সবাই চিনবে চরম ব্যস্ত বন্ধু বা আত্মীয় হিসেবে৷
এত কষ্টের পর আপনি যখন ডাক্তার হবেন ইন্টার্ন লাইফে আপনার কোনো মর্যাদা থাকবে না। যেখানে সিনিয়রদের দায়িত্ব আদর, ভালবাসা এবং শাসন দিয়ে শেখানো- সেখানে আপনাকে দেখা হবে কামলার মত। দিন রাত কঠোর পরিশ্রমের পর আপনি আর পড়ার সময় পাবেন না। সাথে হেয়-প্রতিপন্নতার মানসিক কষ্ট তো আছেই। আর যেসব সিনিয়ররা আপনাকে শিখাবে বা অন্তত ডাক্তারের মত সম্মান করবে - মন থেকে তাদের প্রতি সম্মান আজীবন থেকে যাবে। যারা কষ্ট দিবে আজীবন তাদের প্রতি বদদোয়া এমনিতেই চলে আসবে। শেষ পর্যন্ত আপনি দেখবেন তারা নিজেরাও হ্যাপি না নিজেদের লাইফে😊। আপনার বদদোয়ায় কিনা কে জানে?
এতো গেলো নিজেদের কমিউনিটির সমালোচনা।
এবার আসি সাধারন মানুষ প্রসঙ্গে -
১) আমাদের দেশের আপামর জনগনের একটা ধারনা ডাক্তার মানেই সেবা। মহৎ পেশা। আমরা ডাক্তাররাও মহৎ হতে গিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছি এখন ন্যায্য বেতনটাকে তারা অপরাধ হিসেবে মনে করে। সাধারন মানুষকে বোঝাতে হবে যে ডাক্তারি মহৎ হলেও একটা পেশা । দিন শেষে এটা দিয়ে আমাদের জীবিকা নির্বাহ হয়।
তাই সেবার জায়গা থেকে নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করা যেতে পারে, গরীব রোগীদের জন্য ফান্ড রাখা যেতে পারে- যেটা আমরা অনেক ডাক্তাররাই করে থাকি। কিন্তু আমি যখন চেম্বারে বসব, বিয়ে বা অন্য প্রোগ্রামে এটেন্ড করব তখন এই মহত্বতা আমার কাছে আশা না করাই ভাল। হ্যাঁ, কিছু ক্লোজ মানুষ আছে- যাদের ঋণ কখনো পরিশোধ করা সম্ভব না। এছাড়া বাকিরা যদি দেখলেই আমাকে মহৎ মনে করে রোগ ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে আলাপ না করে, কথার শুরুতেই নিজের সমস্যার কথা চলে আসে তাহলে দুঃখিত, আমি মহৎ নই।
আমার ডাক্তারি করার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে, ওই সময়ে আমি জান-প্রান দিয়ে, সর্বোচ্চ চেষ্টা করে রোগী দেখব, তাদের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করব আমার জ্ঞান দিয়ে, সহানুভূতি দিয়ে। এজন্য আমি যে পড়াশোনা করব, ট্রেনিং করব এতে আপনাদেরই উপকার হবে। এর বাইরে বাকি সময় আমি একজন সাধারন মানুষ। তখন মহত্বতা দেখানো, সেবা করা আমার ইচ্ছা- আপনার অধিকার নয়।
আমার মনে হয় প্রত্যেক ডাক্তারের উচিত সাধারন মানুষকে এই জিনিস বোঝানো যে ডাক্তারি একটা পেশা, সেবা নয়। তাহলে সাধারন মানুষও এই ন্যায্য ভাতা চাওয়াটাকে ক্রাইম হিসেবে দেখবে না।
২) সাধ্যের চেয়ে ৩-৪ গুণ বা তারও বেশী রোগী দেখতে হয় বিধায় ডাক্তাররা অনেক সময় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। আমাদের উচিৎ অতিরিক্ত লোড নিতে অস্বীকার করা। এতে বাকি রোগীদের কি হবে সেটা সরকার ঠিক করবেন। সাধারন মানুষ আমাদের উপর তিক্ত হওয়ার একটাই কারন, আমাদের অনেকের ব্যবহার- যেটা আসলে অতিরিক্ত লোডের কারনে হয়ে থাকে। আমাদের উচিত যথাসম্ভব সহানুভূতির সাথে রোগীদের সাথে কথা বলা।
আমাদের দেশের ডাক্তাররা পর্যাপ্ত লোকবল, অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও যে চিকিৎসা দেন এটা পৃথিবীর অন্যদেশগুলোতে কল্পনাও করতে পারবেন না। আমাদের লিমিটেশন সাধারন মানুষদের বোঝা উচিৎ। ঢালাওভাবে ডাক্তাররা কসাই, এরা শুধু সেবা করবে, ভিজিট নিবে না -এসব চিন্তাধারা বদলানো উচিত।
আমার মনে হয় পাবলিক পোস্টে যারা বাংলাদেশের ডাক্তার খারাপ, কসাই, এরা কেন ভাতা নিবে- এসব বলে তাদের কোনো অসুখ হলে এদেশের ডাক্তারের শরনাপন্ন না হওয়াই ভাল৷
৩) অন্য কোনো পেশায় আপনি এমন খুবই কম পাবেন যে একজন ব্যবসায়ী ফ্রীতে আপনাকে তার দোকানের জিনিস দিয়ে দিচ্ছেন। বা একজন শিক্ষক বা উকিল ফ্রীতে সেবার উদ্দেশ্যে শিক্ষা বা পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা ফ্রীতে না দিলেও কেউ তাদের দোষারোপ করবে না। তাহলে ডাক্তারদেরই কেন ফ্রীতে সবসময় চিকিৎসা ( সেবা নয়) দিতে হবে? বেতন/ ভাতা চাওয়াটাও কি ডাক্তারদের অপরাধ?
৪) একজন ব্যবসায়ী, উকিল, শিক্ষক, বা অন্য পেশার মানুষের সেবা আপনার পছন্দ নাহলে কি তার গায়ে হাত তুলে ফেলেন, তাকে মেরে পিটিয়ে ICU তে পাঠিয়ে দেন? তাহলে ডাক্তারের চিকিৎসা পছন্দ না হলে কেন এমনটা করেন? আপনার চিকিৎসা পছন্দ হয় নি? আপনি অভিযোগ করেন, প্রয়োজনে মামলা করেন। গায়ে হাত তোলার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে? কর্মস্থলে সুরক্ষা চাওয়াটাও কি ডাক্তারদের অপরাধ?