03/08/2026
এই লেখাটা স্কিপ করার আগে আমাকে ৩০ টা সেকেন্ড সময় দেন। কালকে সকালে হয়তো এই লেখাটাই আপনার আব্বা বা আপনার স্বামীর জীবন বাঁচিয়ে দিবে।
বিশ্বাস করেন ভাই, পেটে গ্যাস্ট্রিক ভেবে ভেবে আমরা যে কত বড় ভুল করি, আজকের ২ টা গল্প শুনলে বুঝবেন।
গল্প ১: সুমন ভাই
সুমন ভাই, বয়স ৪২। ঢাকার একটা কলেজের শিক্ষক। মানুষটা একদম সাদামাটা। সারাদিন ক্লাস, কোচিং, রাতে খাতা দেখা। গত ৩ বছর ধরে একটা সমস্যা। পেটে কেমন যেন মোচড় দেয়, টয়লেট ক্লিয়ার হয় না। মাঝে মাঝে পায়খানার সাথে হালকা রক্ত।
উনি ভাবতেন, আরে পাইলস মনে হয়। বা গ্যাস্ট্রিক। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেলেই তো কমে যায়।
ফার্মেসি থেকে Omeprazole, ডমপেরিডন খেয়ে দিন পার। ভাবি কত বলতো, একবার ডাক্তার দেখাও। উনি হাসতেন, আরে ধুর, শিক্ষক মানুষের পেটে গ্যাস থাকবেই।
গল্প ২: রহমান চাচা
রহমান চাচা, বয়স ৫৮। ব্যবসায়ী মানুষ। চট্টগ্রামের। সারাজীবন খেটে সংসার দাঁড় করিয়েছেন।
গত এক বছরে উনার ওজন ৮ কেজি কমে গেছে। কেউ বললে বলতেন, ডায়েট করছি।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে উনার শরীর দুর্বল, সবসময় পেট ভরা লাগে, খেতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে পেটে এমন ব্যথা যে মনে হয় পেট কামড়াচ্ছে। উনার ছেলে বিদেশ থেকে বলে, আব্বা Colonoscopy করাও। উনি রেগে যান, এই বয়সে আবার নল ঢুকানো! কী দরকার?
দুইটা মানুষ, দুইটা বয়স, দুইটা শহর...
কিন্তু ভিলেন একজনই...
ভিলেনের নাম কোলন ক্যান্সার।
সুমন ভাই আর রহমান চাচার শেষমেশ কী হলো জানেন? যখন ব্যথা আর সহ্য করতে না পেরে ডাক্তারের কাছে গেলেন, Colonoscopy করে দেখা গেল পেটের ভেতর বছরের পর বছর ধরে ছোট ছোট আঁচিলের মতো Polyp বড় হতে হতে ক্যান্সার হয়ে গেছে।
পলিপ জিনিসটা কী জানেন?
আমাদের পায়খানার রাস্তা, যেটাকে আমরা Colon বলি, সেটা একটা পাইপের মতো। এই পাইপের ভেতরের দেয়ালে অনেক সময় ছোট মাংসের টুকরার মতো ফুলে ওঠে। এটাই Polyp।
এটা প্রথমে একদম নিরীহ। কোনো ব্যথা নেই। আপনি বুঝতেও পারবেন না। কিন্তু বছরের পর বছর যদি এটা পেটের ভেতরে পড়ে থাকে, এটাই একদিন ক্যান্সার হয়ে যায়। সুমন ভাইরা যে গ্যাস্ট্রিক ভেবে ওষুধ খায়, আসলে সেটা গ্যাস্ট্রিক ছিলই না। সেটা ছিল পলিপের সিগন্যাল।
কেন হয় এই সর্বনাশ? ডাক্তাররা ৩-৫ টা কারণকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করে।
১. আমাদের প্লেটে আঁশ নেই, আছে শুধু মাংস আর তেল: সকালে পরোটা, দুপুরে গরুর মাংস, রাতে ফাস্ট ফুড। শাক-সবজি, ডাল, ফল আমরা খাই না বললেই চলে। Fiber বা আঁশ ছাড়া পায়খানা শক্ত হয়, Colon এর ওপর চাপ পড়ে, Polyp হওয়ার রিস্ক বাড়ে।
২. বসে থাকা জীবন: সারাদিন চেয়ারে বসে কাজ, বাসায় এসে সোফায় শুয়ে মোবাইল। হাঁটাচলা নেই। পেটের নড়াচড়া কমে যায়, খাবার পেটে পচতে থাকে।
৩. সিগারেট আর মদ: এটা Colon এর জন্য স্লো পয়জন। যারা নিয়মিত ধূমপান করেন, তাদের কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশি।
৪. বংশে থাকলে: আপনার বাবা, মা, ভাই, বোন কারো যদি ৬০ বছরের আগে Colon Polyp বা Colon Cancer হয়ে থাকে, আপনার রিস্ক ২-৩ গুণ বেশি। এটা জেনেটিক।
এবার সবচেয়ে জরুরি অংশ। কোন লক্ষণগুলোকে আমরা গ্যাস্ট্রিক ভেবে ভুল করি?
মন দিয়ে শুনেন ভাই, এই ৫ টা লক্ষণকে কখনো অবহেলা করবেন না:
১. পায়খানার অভ্যাস হঠাৎ বদলে যাওয়া। কখনো কষা, কখনো পাতলা, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।
২. পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া বা কালো আলকাতরার মতো পায়খানা। ভাববেন না এটা শুধু পাইলস।
৩. মনে হবে টয়লেট করে পেট খালি হলো না, আবার যেতে হবে।
৪. কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, মুখের রুচি নষ্ট হয়ে যাওয়া, সবসময় দুর্বল লাগা।
৫. পেটে কামড়ানো ব্যথা, যেটা গ্যাসের ওষুধেও কমে না।
আপনার বা আপনার পরিবারের কারো এই লক্ষণগুলো ২-৩ সপ্তাহের বেশি থাকলে প্লিজ ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে বসে থাকবেন না।
ভয় পাইয়েন না ভাই... সুখবর হচ্ছে...
কোলন ক্যান্সার সবচেয়ে ভালোভাবে চিকিৎসাযোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটা, যদি আমরা সময়মতো ধরে ফেলতে পারি। Polyp অবস্থায় ধরে ফেললে, Colonoscopy করেই সেটা কেটে ফেলে দেওয়া যায়। কাটাছেঁড়া ছাড়াই। আর Polyp ক্যান্সার হতে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। মানে আমাদের হাতে অনেক সময় আছে।
তাহলে আমরা কী করবো? ৩ টা বাস্তবসম্মত কাজ, যেটা কোলন বিশেষজ্ঞরা বলে।
১. ৪৫ এর পর একবার Colonoscopy: ভয়ের কিছু নেই। এখন ঘুমের ওষুধ দিয়ে করে, আপনি টেরও পাবেন না। বয়স ৪৫ হয়ে গেলে, পরিবারে হিস্ট্রি থাকলে ৪০ এর পর, একবার ডাক্তারের সাথে কথা বলে Colonoscopy করিয়ে নেন। এটাই জীবন বাঁচায়।
২. প্লেটে আঁশ ফেরান: প্রতিদিন অন্তত একবাটি শাক-সবজি, একটা ফল, লাল চাল বা লাল আটার খাবার। লাল মাংস মানে গরু, খাসি সপ্তাহে ১-২ দিনের বেশি না। আর প্রতিদিন ২-২.৫ লিটার পানি।
৩. শরীরকে নড়ান: দিনে ৩০ মিনিট হাঁটেন। লিফট না, সিঁড়ি ব্যবহার করেন। পেটের ব্যায়াম করেন। আর ধূমপানটা আজকেই ছাড়েন ভাই।
এই লেখাটা লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছে। কারণ আমার ইনবক্সে এমন কত সুমন ভাইয়ের গল্প জমা হয়ে আছে।
আমরা গ্যাস্ট্রিক ভেবে ভেবে বছরের পর বছর নষ্ট করি। আর ভেতরে Polyp টা চুপচাপ বড় হতে থাকে।
তাই দয়া করে লেখাটা শেয়ার করে রাখেন। আপনার একটা শেয়ারে হয়তো আপনার লিস্টের কেউ একজন কালকেই ডাক্তারের কাছে যাবে। সেভ করে রাখেন, পরিবারের গ্রুপে দিয়ে দেন।
বুকে হাত দিয়ে বলেন তো...
শেষ কবে আপনি বা আপনার আব্বা-আম্মা কোনো কারণ ছাড়াই পায়খানার সাথে রক্ত দেখেও গ্যাস্ট্রিক ভেবে চুপ করে ছিলেন?
কমেন্টে লিখেন, আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো।
হাকিম হাফেজ মাওঃ ইমরান আল জিহাদী
রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক।
ডিপ্লোমা-ইন হিজামা এন্ড রুকাইয়া শরইয়্যাহ চিকিৎসা।
পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুনঃ 01810-632177