12/08/2026
চেম্বারে আসা ছোট্ট মেয়েটি আসলে কী বলতে চেয়েছিল?
সেদিন চেম্বারে একটি আট বছরের মেয়েকে নিয়ে তার মা এসেছিলেন। মায়ের অভিযোগ ছিল, মেয়েটি গত কয়েক মাস ধরে খুব জেদি হয়ে গেছে। সামান্য কিছু হলেই রেগে যায়, পড়তে বসতে চায় না, মায়ের সঙ্গে তর্ক করে এবং মাঝে মাঝেই নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে থাকে। মা বলছিলেন, ছোটবেলায় মেয়েটি খুব শান্ত ছিল, কিন্তু এখন যেন একেবারে বদলে গেছে।
প্রথমে মেয়েটি খুব চুপচাপ ছিল। মায়ের পাশে বসে ছিল, কিন্তু আমার দিকে খুব একটা তাকাচ্ছিল না। আমি তাকে পড়াশোনা বা তার সমস্যা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করিনি। বরং তার স্কুল, বন্ধু, পছন্দের খেলা এবং অবসরে কী করতে ভালো লাগে সেসব নিয়ে ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করলাম।
কিছুক্ষণ পর সে একটু স্বাভাবিক হলো। তারপর কথায় কথায় জানাল, সে এখন স্কুলে যেতে খুব একটা ভালোবাসে না। কারণ তার কয়েকজন সহপাঠী তার পড়াশোনা নিয়ে মজা করে এবং ক্লাসে কোনো উত্তর ভুল হলে হাসাহাসি করে। কয়েকদিন আগে সে একটি উত্তর ভুল বলেছিল এবং সবাই হেসেছিল। সেই ঘটনার পর থেকে ক্লাসে হাত তুলে উত্তর দিতে তার ভয় লাগে।
মেয়েটি আরও বলল, বাড়িতে ফিরে সে যখন পড়তে বসে, তখন তার মনে হয় আবার যদি ভুল হয়। তখন পড়তে বসতে তার খুব বিরক্ত লাগে। মা তাকে অলস ভাবেন, পড়াশোনার জন্য বকাঝকা করেন এবং সে আরও রেগে যায়।
মায়ের কাছে যে আচরণটি ছিল জেদ, শিশুটির কাছে সেটিই ছিল নিজের ভয় এবং অস্বস্তি সামলানোর একটি উপায়।
অনেক সময় আমরা শিশুদের আচরণ দেখি, কিন্তু সেই আচরণের পেছনে থাকা অনুভূতিটা দেখতে পাই না। একটি শিশু যখন পড়তে চায় না, তখন তার সমস্যা সবসময় অলসতা নাও হতে পারে। একটি শিশু যখন স্কুলে যেতে চায় না, তখন তার কারণ সবসময় পড়াশোনার প্রতি অনীহা নাও হতে পারে। একটি শিশু যখন হঠাৎ রেগে যায়, তখন তার ভেতরে হয়তো এমন কোনো কষ্ট রয়েছে যা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না।
সেদিন মেয়েটির সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর তার মা বুঝতে পারলেন যে এতদিন তিনি মেয়েটির আচরণ ঠিক করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আচরণের কারণটি বোঝার চেষ্টা করেননি।
শিশুরা সবসময় বলতে পারে না যে তারা ভয় পাচ্ছে। তারা সবসময় বলতে পারে না যে তারা অপমানিত বোধ করছে। তারা সবসময় বলতে পারে না যে স্কুলে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে। কখনও কখনও তারা শুধু চুপ হয়ে যায়, কখনও রেগে যায়, কখনও পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়, আবার কখনও বাবা মায়ের সঙ্গে অকারণে তর্ক করতে শুরু করে।
তাই কোনো শিশুর আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, কীভাবে ওকে ঠিক করা যায়। প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, ওর সঙ্গে কী ঘটছে?
শিশুর আচরণকে সীমা দেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সীমা দেওয়ার পাশাপাশি তার অনুভূতিটাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে ভুল করা স্বাভাবিক, সাহায্য চাওয়া স্বাভাবিক এবং কোনো সমস্যা হলে বড়দের সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ।
শিশুকে শুধু ভালো ফল করতে শেখানো নয়, তাকে নিজের অনুভূতি চিনতে এবং প্রকাশ করতে শেখানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি শিশু যখন বলে আমি পারব না, তখন কখনও কখনও তার কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে আমি ভুল করলে সবাই আমাকে নিয়ে হাসবে।
যখন সে বলে আমি স্কুলে যাব না, তখন তার ভেতরে থাকতে পারে স্কুলে গেলে আমি নিরাপদ বোধ করি না।
আর যখন সে রেগে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন হয়তো সে আসলে বলতে চাইছে আমার কষ্টটা কেউ বুঝতে পারছে না।
তাই শিশুকে বিচার করার আগে একটু থামুন। তার আচরণ দেখুন, কিন্তু সেই আচরণের পেছনে থাকা অনুভূতিটাকেও বোঝার চেষ্টা করুন।
একটি শিশুকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় অনেক সময় তাকে আরও বেশি শাসন করা নয়। বরং তাকে এমন একটি নিরাপদ সম্পর্ক দেওয়া, যেখানে সে নিজের কথা বলতে পারে, ভুল করতে পারে এবং সাহায্য চাইতে পারে।
শিশুর আচরণের পেছনের কারণটি বুঝতে পারলে অনেক সময় সেই আচরণটিই আমাদের কাছে নতুন একটি অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।
✍️ Psychologist Rachayita Das