24/08/2026
লাস্ট কয়েক বছরে ৮-১০ বছর বয়সে মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়ে যাচ্ছে?
তাহলে আমাদের শিশুরা কি সময়ের আগেই বড় হয়ে যাচ্ছে?(ধৈর্য ধরে বলুন নিজের বাচ্চার জন্য)
এক সময় মেয়ে শিশুদের বয়ঃসন্ধি বা পিরিয়ড শুরু হওয়ার স্বাভাবিক বয়স ছিল ১২ থেকে ১৪ বছর। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ১০ বছর হওয়ার আগেই শিশুদের মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন চলে আসছে। বিষয়টি কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিকভাবেও একটি শিশুর জন্য বেশ চাপের।
একটা রিসেন্ট ঘটনা বলি। চেম্বারে একজন পেশেন্ট এসেছেন। বয়স ১০+। মেয়েটার পিরিয়ড শুরু হয়েছে ১০ বছরে পা দেয়ার পরেই। স্পটিং বা লাল স্রাব আসা শুরু হয়েছে আরো ৬ মাস আগে থেকে। অর্থাৎ ৯.৫ বছর বয়স থেকে।
আর গত কয়েক বছর ধরেই দেখছি ক্লাস টু,থ্রি তে ওঠার পরেই মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হচ্ছে।
কেন এমন হয়?
বর্তমানে শিশুদের শরীরে সময়ের আগেই বড় হয়ে ওঠার লক্ষণগুলো আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের পরিবেশগত দূষণ এবং খাদ্যাভ্যাসের চরম বিপর্যয়ের ফল। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে Endocrine Disrupting Chemicals (EDCs) এবং পুষ্টিহীন আধুনিক ডায়েট।
১) প্রোটিন ও ফ্যাট টক্সিসিটি- আমাদের শিশুদের বর্তমান খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রাকৃতিক খাবারের চেয়ে প্রসেসড খাবারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আমাদের শিশুদের প্রোটিনের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রয়লার মুরগি। কমার্শিয়াল মিট বা ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য অনেক সময় বিভিন্ন গ্রোথ প্রোমোটার বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়। এই উপাদানগুলো শিশুদের শরীরে গিয়ে এস্ট্রোজেন মিমিক্রি (Estrogen Mimicry) তৈরি করে। অর্থাৎ, মেয়েদের শরীরে থাকা এস্ট্রোজেন হরমোনের মত হরমোনের মিমিক্রি করে। যার ফলে শরীর মনে করে প্রচুর এস্ট্রোজেন তৈরি হচ্ছে, যা অকাল বয়ঃসন্ধিকে ট্রিগার করে।
২)ওমেগা-৬ ও ওমেগা-৩ টক্সিসিটি: ফাস্টফুড, ফ্রাইড চিকেন, নাগেটস আর সয়াবিন তেলে ভাজা খাবারে প্রচুর ওমেগা-৬ থাকে। কিন্তু দেখা যায় বাচ্চারা মাংস খেলেও মাছ একদমই খেতে চায়না। তাই খাদ্যতালিকায় মাছ বা ওমেগা-৩ এর অভাব থাকায় শরীরে ওমেগা ৬ এর পরিমান বেড়ে যায় এবং এক ধরণের ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ তৈরি হয়। এই ইনফ্লামেশন মেটাবলিক স্ট্রেস বাড়িয়ে পিউবার্টিকে এগিয়ে আনে।
৩)লেপটিন ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: বর্তমানে বাচ্চাদের ম্যাক্সিমাম খাবারে বাইরের খাবার ইনক্লুড থাকে। টিফিন থেকে শুরু করে ঘরের নাস্তা সব কিছুতেই আটা ময়দা এবং চিনির উপস্থিতি দেখা যায়। অতিরিক্ত চিনি, কার্বোনেটেড ড্রিঙ্কস এবং ময়দার তৈরি খাবার ইনসুলিন স্পাইক ঘটায়। শরীরে চর্বি বাড়লে লেপটিন নামক হরমোন বেশি নিঃসরণ হয়। এই লেপটিন সরাসরি মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় পিউবার্টি শুরু করার জন্য। একে বলা হয় 'ক্রিটিক্যাল বডি ফ্যাট হাইপোথিসিস'।
এছাড়াও চিনিযুক্ত পানীয় (সফট ড্রিঙ্কস), সাদা পাউরুটি, বিস্কুট এবং ময়দার তৈরি খাবার ইনসুলিন হরমোনকে বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ ইনসুলিন সরাসরি সেক্স হরমোন বাইন্ডিং গ্লোবুলিন (SHBG) কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তে ফ্রি এস্ট্রোজেনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে আর্লি পিউবার্টি শুরু হয়। এছাড়া বার্গার পিজ্জা তে ব্যাবহার করা সসেজ, সালামি বা নাগেটসে থাকা প্রিজারভেটিভগুলো শিশুদের লিভারের ওপর চাপ ফেলে, যা হরমোন মেটাবলিজমের প্রধান কেন্দ্র। লিভারে প্রেসার পরলে তখন হরমোনাল সাইকেল উলটা পালটা হয়ে যায়।
৪) স্ট্রেস, স্ক্রিন টাইম ও ভিটামিন-ডি এর অভাব: আমাদের সোসাইটতে এখন সব থেকে বড় সমস্যা স্ট্রেস। ছোট বাচ্চাদের এত্ত বেশি পড়াশোনা আর ফার্স্ট হবার প্রেশার থাকে যে এরা এর বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। এরপরেই আসে ডিভাইস এডিকশন। বিশেষ করে শহরে বাচ্চাদের বাইরে যাবার সুযোগ কম থাকায় এবং বাবা মা বাচ্চা কে পর্যাপ্ত সময় না দিতে পেরে ডিভাইস ধরিয়ে দেন। পড়াশোনার স্ট্রেস আর ডিভাইসে (মোবাইল/ট্যাব) বুঁদ হয়ে থাকা, শিশুদের মেলাটোনিন হরমোন কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বাচ্চারা রোদে বের হয়না, খেলাধুলার সুযোগ কম। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো বা ভিটামিন-ডি এর অভাবও আর্লি পিউবার্টির অন্যতম কারণ হিসেবে গবেষণায় প্রমাণিত।
৫)অদৃশ্য কেমিক্যাল এক্সপোজার: এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টার্স (EDCs)-
খাবারের পাশাপাশি আমাদের চারপাশের পরিবেশও শিশুদের হরমোন ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Endocrine Disrupting Chemicals (EDCs)।
বিসফেনল এ (BPA) ও প্লাস্টিক: প্লাস্টিকের বোতল বা টিফিন বক্স থেকে নির্গত BPA শরীরে গিয়ে এস্ট্রোজেনের মতো আচরণ করে। এটি শিশুদের প্রজননতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়।
থ্যালেটস (Phthalates) ও পারফিউম: শিশুদের কসমেটিকস, শ্যাম্পু বা কড়া সুগন্ধিতে থাকা থ্যালেটস হরমোনাল ডিসরাপশন ঘটাতে পারে।
প্যারাবিনস ও টক্সিন: প্রসাধনীতে থাকা প্রিজারভেটিভগুলো সরাসরি রক্তে মিশে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
➡️আমাদের তাহলে কি করা উচিৎ??
শিশুদের এই জটিলতা থেকে বাঁচাতে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করা ছাড়া গতি নেই:
১) প্রথমেই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। ব্রয়লার মুরগির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশি মুরগি, সামুদ্রিক বা ছোট মাছ, ডিম এবং মাংস খাওয়া যেতে পারে।
ফুলকপি, ব্রকলি বা বাধাকপিতে থাকা DIM (Diindolylmethane) শরীর থেকে বাড়তি এস্ট্রোজেন বের করে দিতে সাহায্য করে।
প্রোটিন খেতে উৎসাহিত করা এবং ওমেগা থ্রি রিচ মাচ রেগুলার খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।
২)প্লাস্টিক বর্জন করে কাঁচ বা স্টিলের বা তামার পাত্র ব্যবহার নিশ্চিত করুন
৩) বাচ্চাদের দিনে একটা নির্দিষ্ট সময় রোদে খেলাধুলা করার সুযোগ দিন। প্রতিদিন অন্তত ৩০-৬০ মিনিট ।
৪) তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ।
©Sumya Shila
Clinical Nutritionist and Diet Consultant
The Genius Child - প্রতিভাবান শিশুটি
#মানসিকস্বাস্থ্য