29/05/2026
২০২০ এর ঘোর কোভিড কাল। আসামের তেজপুরের LGBRIMH এ তখন সদ্যই পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে যোগ দিয়েছি। চারদিকের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেই একদিন শুনলাম, আমার মেয়েবেলার হিরোর মুম্বাইতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর কুয়াশা সরিয়ে যখন জানা গেলো তিনি অবসাদে ভুগছিলেন তখনই চারপাশ থেকে কানে উড়ে আসতে থাকলো—"আরে ওর তো টাকা-পয়সা, নাম, গাড়ি, বাড়ি, বান্ধবী সবই আছে! ওর আবার কিসের অবসাদ!!"
এর মাস ছয়েক পরের ঘটনা। LGBRIMH ওপিডিতে এক গ্রামীণ যুবা তার মায়ের সাথে এসেছে। যুবাটি একপ্রকার জোর করেই দেখাতে এসেছে কারণ তার অনেক দিন ধরেই কাজের উদ্যম কমে যাচ্ছে, ইদানীং ঘুমও একটানা হয় না, খাওয়ার ইচ্ছাও নেই। আগে ফুটবল খেলতে যেতো রোজ বিকেলে ইদানীং যেতেও ইচ্ছা করেনা। যুবাটির সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর বোঝা গেলো যে অবসাদ তাকে ঘিরে ফেলেছে - কাউন্সেলিং এর সাথে সাথে কিছুদিন ওষুধ খেতে হবে। তার মা কে ডেকে জানানো হলো যে কিছু সমস্যা আছে তবে ঠিক হয়ে যাবে সাথে অল্প কথায় কেয়ার গিভিং এর সামান্য কিছু অংশ বলা হলো। এবার ওই মা আমায় সরাসরি অসমিয়া ভাষায় বলে বসলেন—"এসব হচ্ছে বড়লোকদের রোগ, আমার ছেলের এসব নেই। ছেলে জোর করে এসেছে বটে কিন্তু ওষুধ ওকে খাওয়াবো না, আর আনবো ও না।"
আমাদের সমাজ মানসিক স্বাস্থ্যকে ঠিক এই দুটো চরম ভুল ধারণার বেড়াজালে আটকে রেখেছে। একদল ভাবেন—সব থাকলে অবসাদ আসতে পারে না, আর অন্যদলের ধারণা—নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সংসারে অবসাদ হওয়াটা আসলে একধরণের 'বিলাসবহুল আদিখ্যেতা'! যেন যারা বিত্তশালী নন, তাদের অবসাদ হতেই নেই!
আসলে বাস্তবটা একদম সে রকম নয়। আমার স্কুলবেলায় হেডব্যাং করা শুরু, চেস্টার বেনিংটন (Linkin Park)-এর গান শুনে। সেই মানুষটা ২০১৭ সালের ৬ই জুলাই বার্মিংহামে হাজার হাজার মানুষের সামনে স্টেজ কাঁপিয়ে শো করার ঠিক দু-সপ্তাহ পরে, ২০শে জুলাই নিজেকে শেষ করে দেন। সাফল্য, ব্যাংক ব্যালেন্স, সামাজিক স্তর কিংবা বাইরের হাসিখুশি মুখ দেখে মানুষের ভেতরের লড়াই চেনা যায় না।
মস্তিষ্কের ভেতরের জটিল নিউরোনাল নেটওয়ার্কে ডোপামিন (Dopamine), সেরোটোনিন (Serotonin) বা নরএপিনেফ্রিন (Norepinephrine)-এর মতো জরুরি নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর ভারসাম্যহীনতা হলে তা যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই হতে পারে। ডায়াবেটিস যেমন কোনো ধনী-দরিদ্রের বিচার করে শরীরে থাবা বসায় না, ডিপ্রেশনও ঠিক তেমনি একটি নিখাদ মেডিকেল কন্ডিশন।
বাইরে সবার সামনে স্বাভাবিক হাসিমুখ থাকার অভিনয় করতে করতে নিজের মনের মধ্যেকার ঝড় সামলানো (Smiling Depression) যে কতখানি ভয়ানক, তা কেবল সেই মানুষটিই জানেন যিনি প্রতিদিন এই নীরব লড়াইটা লড়ছেন। সে তেজপুরের ওপিডির সাধারণ গ্রামীণ যুবাই হোক, কিংবা মুম্বাই-লন্ডনের সেলিব্রিটি—মস্তিষ্কের ভেতরের বিজ্ঞানটা সবার জন্যই এক।
সমাজ কী বলবে, লোকে 'বড়লোকী রোগে আক্রান্ত' বলে উপহাস করবে, নাকি ব্যাক্তি সফলতার দিকে আঙুল তুলবে—এই ভয়ে কতো মানুষ যে এই লড়াই বছরের পর বছর বুকের ভেতর চেপে রেখে ক্লান্তিকর মুখোশ পরে থাকেন তা বলে বোঝানো মুশকিল। মাঝে মাঝে কোনো বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব অবসাদে ভুগে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে সমাজ কয়েকদিনের জন্য একটু নড়ে চড়ে বসে। ঘটনার সপ্তাহ দুয়েক পেরোনোর পরেই আবার মানসিক ভাবে ভালো না থাকাটাকে অপরাধ হিসাবে দেখা হতে থাকে। একটা রোগকে অস্বাভাবিক ভাবে লুকিয়ে রেখে হাসিমুখেই কতশত লোকের জীবন চলতে থাকে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা জানতে পারলেই আশপাশ থেকে উড়ে আসে বিদ্রুপ "কি রে তুই নাকি মন খারাপ করে পাগল হয়ে যাচ্ছিস!, পাগলের ডাক্তার দেখাচ্ছিস!!" আবার মানুষটার কিছু হয়ে গেলে, কিছু চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে সেই বিদ্রুপকারীই ওয়ালে পোস্ট করেন "আমায় তো বলতে পারতি ভাই, আমি শুনতাম!"