18/09/2026
“ভাড়া কত দেব?”
ক্যান্সার রোগী অটোতে উঠেছেন। হাসপাতালের দিকে যাচ্ছেন।
অটোচালক হয়তো জানেন, এই যাত্রীর সামনে কী কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
তাই গন্তব্যে পৌঁছে রোগী যখন বলেন,
— “কত ভাড়া দেব?”
উত্তর আসে,
— “কিছু দিতে হবে না। আপনি চিকিৎসা করান।”
ভাবুন তো, একজন অটোচালকের জন্য এই টাকাটা হয়তো খুব একটা কম নয়।
তিনি নিজেও খুব বড়লোক নন। সারাদিন অটো চালিয়ে সংসার চালান। তাঁরও পরিবার আছে, সন্তান আছে, বাড়ির খরচ আছে।
তারপরও তিনি একজন ক্যান্সার রোগীর কাছ থেকে ভাড়া নিলেন না। এটা শুধুই একটা বিনামূল্যের অটোযাত্রা নয়। এটা আসলে একজন মানুষের আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসা-যাওয়া—কথাটা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে অনেক পরিবারের কাছে সেটা ততটাই কঠিন।
ওষুধের খরচ আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ আছে। হাসপাতালের খরচ আছে। তার সঙ্গে আছে প্রতিদিনের যাতায়াতের খরচ।
বিশেষ করে দূরের কোনও ক্যান্সার হাসপাতালে যখন বারবার যেতে হয়, তখন অনেক পরিবারের কাছে হাসপাতালে পৌঁছনোটাই একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু এই কঠিন সময়ে কখনও কখনও পাশে এসে দাঁড়ান এমন কিছু মানুষ, যাঁদের কাছ থেকে আমরা হয়তো এমনটা আশাই করি না।
তাঁদের একজন—অটোচালক।
---
সম্প্রতি ডক্টর উদীপ্ত গোস্বামীর একটি গবেষণার কথা জানতে পেরে মনটা ভরে গেল
ডক্টর উদীপ্ত গোস্বামীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল একটি ক্যান্সার কংগ্রেসে। সেখানেই আলাপ, একসঙ্গে চা খাওয়া—আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যেন বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।
খুব মিশুকে ছেলে। মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। প্রাণচঞ্চল, হাসিখুশি একটা মানুষ।
চেন্নাই থেকে মেডিক্যাল অনকোলজিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন সে ত্রিবান্দ্রামের রিজিওনাল ক্যান্সার সেন্টার (আরসিসি)-এ কর্মরত।
গত বছর কেরালায় বেড়াতে গিয়ে ত্রিবান্দ্রামে উদীপ্তর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল। নিজে থেকেই আমার হোটেলে এসে আমাকে রাতে ওদের ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ আড্ডা হয়েছিল। সেই আড্ডায় আবারও মনে হয়েছিল—ছেলেটার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রাণশক্তি আছে।
আর সেই উদীপ্ত যখন ক্যান্সার রোগীদের পাশে দাঁড়ানো এই অটোচালকদের নিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা স্টাডি করেছে, সত্যি বলতে কী, একজন সিনিয়র সহকর্মী হিসেবে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।
ত্রিবান্দ্রামের রিজিওনাল ক্যান্সার সেন্টারকে ঘিরে ২৫ জন অটোচালককে নিয়ে করা এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাঁদের একটা বড় অংশ নিয়মিত ক্যান্সার রোগী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে নিয়ে যান।
অনেকেই বিনামূল্যে বা কম ভাড়ায় রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেন।
প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চালক প্রতি সপ্তাহে অন্তত কয়েকজন ক্যান্সার রোগী বা তাঁদের পরিজনকে বহন করেন।
আরও আশ্চর্যের বিষয়—অনেক চালক বলেছেন, তাঁরা কোনও কোনও রোগীর জন্য অপেক্ষাও করেন, অতিরিক্ত টাকা না নিয়েই।
অর্থাৎ শুধু হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া নয়— প্রয়োজনে রোগীর চিকিৎসা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাও তাঁদের মানবিক দায়িত্বের অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই সাহায্যেরও একটা মূল্য আছে, এই মানুষগুলোর কথা আমরা খুব কমই ভাবি।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৭২% অটোচালক বলেছেন যে রোগীদের কম বা বিনামূল্যে ভাড়া দেওয়ার কারণে তাঁদের কিছুটা আয় কমে যায়। কেউ কেউ এই ক্ষতিকে মাঝারি থেকে গুরুতর বলেও বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ তাঁরা শুধু তাঁদের সময় দিচ্ছেন না, নিজেদের উপার্জনের একটা অংশও ছেড়ে দিচ্ছেন।
তারপরও তাঁরা কেন করছেন?
উত্তরটা খুব সুন্দর।
সবচেয়ে বড় কারণ—সামাজিক দায়বদ্ধতার অনুভূতি।
কেউ হয়তো নিজের পরিবারে ক্যান্সার দেখেছেন।
কেউ হয়তো কোনও কাছের মানুষকে এই রোগে হারিয়েছেন।
কেউ হয়তো শুধু বিশ্বাস করেন—
“আজ আমি যদি একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, হয়তো এটাই সবথেকে বড় পুজো, উপাচার অথবা ইবাদত—একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষ হয়ে দাঁড়ানো।"
---
আমরা হাসপাতালের ক্যান্সার কেয়ার নিয়ে কথা বলি, নতুন ওষুধ নিয়ে কথা বলি। ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, কেমোথেরাপি নিয়ে আলোচনা করি। এসব অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু মাঝে মাঝে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাই - রোগীকে চিকিৎসার কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ চিকিৎসা তখনই সম্ভব, যখন রোগী হাসপাতালে আসতে পারেন।
একজন রোগী যদি টাকার অভাবে হাসপাতালে আসতে না পারেন, তাহলে পৃথিবীর সেরা চিকিৎসাটাও তাঁর কাছে অর্থহীন।
সেই জায়গায় একজন অটোচালক হয়ে উঠতে পারেন চিকিৎসাব্যবস্থার এক নীরব সহযোদ্ধা।
আর উদীপ্তর এই গবেষণার সবচেয়ে সুন্দর দিকটা আমার কাছে এখানেই।
ক্যান্সার চিকিৎসার মতো অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর একটি ক্ষেত্রেও সে মানুষের এই ছোট ছোট মানবিকতাকে চিকিৎসার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
---
“ডাক্তারবাবু, আমাদেরও তো সংসার আছে…”
অবশ্যই আছে।
এই অটোচালকদের কাছ থেকে অসীম ত্যাগ আশা করা যায় না।
তাঁদেরও উপার্জন করতে হবে।
তাঁদের গাড়িতে জ্বালানি ভরতে হয়। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আছে। পরিবারের দায়িত্ব আছে।
তাই এই উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া চালকদের একটা বড় অংশ বলেছেন, যদি তাঁদের জন্য কিছু সুবিধা—যেমন অগ্রাধিকার পার্কিং, জ্বালানি ভাউচার বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়া যায়, তাহলে তাঁরা আরও বেশি রোগীকে সাহায্য করতে আগ্রহী।
এখানেই একটা সুন্দর মডেলের কথা ভাবা যায়।
রোগীর জন্য বিনামূল্যে যাত্রা—কিন্তু চালকের জন্য সম্মান ও সহায়তা।
---
আমরা কি এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারি না?
প্রতিটি বড় ক্যান্সার হাসপাতালের আশেপাশে এমন কিছু অটো বা ট্যাক্সিচালককে চিহ্নিত করা যেতে পারে, যাঁরা ক্যান্সার রোগীদের জন্য বিশেষ পরিষেবা দেবেন।
হাসপাতাল তাঁদের একটি পরিচয়পত্র দিতে পারে।
নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা হতে পারে।
এনজিও বা সিএসআর-এর মাধ্যমে জ্বালানি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
হাসপাতালের সামাজিক পরিষেবা বিভাগ রোগীদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে।
এতে লাভ হবে দু'পক্ষেরই।
রোগী পাবেন নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত।
আর অটোচালকরা পাবেন তাঁদের মানবিক কাজের স্বীকৃতি এবং কিছু বাস্তব সহায়তা।
---
ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু ওষুধে নয়
উদীপ্তর এই কাজটা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে একটা বিষয় নতুন করে ভাবিয়েছে।
আমরা যারা ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত, আমরা প্রতিদিন ক্যান্সার কোষকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করি।
কিন্তু একজন রোগীর চিকিৎসা মানে শুধু প্রেসক্রিপশন লেখা নয়।
তার হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারা,
চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারা,
চিকিৎসার খরচ সামলাতে পারা,
মানসিকভাবে ভেঙে না পড়া—
সবকিছুই ক্যান্সার কেয়ারের অংশ।
আর এই লড়াইয়ে ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল, পরিবার—সবার পাশাপাশি কখনও কখনও একজন অটোচালকও হয়ে উঠতে পারেন রোগীর নীরব সহযোদ্ধা।
উদীপ্ত, তোমার এই কাজের জন্য সত্যিই কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
একজন মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট হিসেবে তুমি আমাদের আবার মনে করিয়ে দিলে— "ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলার লড়াই নয়। এটা একজন মানুষকে তার কঠিনতম সময়ে মানুষের মতো করে পাশে থাকার লড়াইও।"
হয়তো একজন অটোচালকের হাতে কোনও কেমোথেরাপির ওষুধ নেই। কোনও অত্যাধুনিক মেশিন নেই। কোনও প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষমতাও নেই।
কিন্তু তাঁর কাছে আছে একটা অটো, কিছুটা সময়, আর একটা মানবিক মন।
আর কখনও কখনও, একজন অসহায় ক্যান্সার রোগীর জন্য এইটুকুই অনেক বড় হয়ে ওঠে।
উদীপ্ত, সত্যি তোমার জন্য খুব গর্ব হচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের দেশের ক্যান্সার চিকিৎসার মূল জায়গাগুলোর একটি তুমি ধরতে পেরেছ—ক্যান্সারের চিকিৎসাকে আরও মানবিক করে তোলার জায়গাটা।
তোমার এই ভাবনা শুধু একটি গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও অনেক হাসপাতাল, আরও অনেক শহর, আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছক।
কারণ শেষ পর্যন্ত— ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় বড় আবিষ্কারের পাশাপাশি এই ছোট ছোট মানবিকতার গল্পগুলোর গুরুত্ব কোনও অংশেই কম নয়।
আর হয়তো এই ছোট ছোট মানবিকতাগুলিই একদিন আমাদের ক্যান্সার চিকিৎসাকে শুধু আরও উন্নত নয়, আরও মানবিক করে তুলবে।