24/08/2026
কেমো শেষ, এবার এই ইনজেকশন! কেন দিতে হয় জানেন?
কেমোথেরাপি শেষ হওয়ার পর অনেক রোগী বা বাড়ির লোক আমাকে জিজ্ঞেস করেন—“ডাক্তারবাবু, কেমোর পর একটা ইনজেকশন নিতে বলেছেন। এটা আবার কী? কেন দিতে হবে?”
“চামড়ার তলায় দিতে হবে নাকি?”
“কেমোর কতক্ষণ পরে দেব?”
“পেটে দেব, হাতে দেব, কোথায় দিলে ভালো?”
“হাসপাতাল থেকে যে ওষুধটা দিয়েছে, বরফ দিয়ে রাখতে বলেছে। ওষুধটা যদি গরম হয়ে যায়, তাহলে কি নষ্ট হয়ে যাবে?”
চলুন, আজ খুব সহজ করে এই ইনজেকশনটার গল্প জানা যাক।
এই ওষুধগুলিকে বলা হয় কলোনি স্টিমুলেটিং ফ্যাক্টর। সহজ করে বললে, এগুলো শরীরকে সাদা রক্তকণিকা তৈরি করতে উৎসাহ দেয়। এর মধ্যে ফিলগ্রাস্টিম এবং পেগফিলগ্রাস্টিম খুব পরিচিত নাম।
কেমোথেরাপিয়ার পর কিছু সময়ের জন্য শরীরের সাদা রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যেতে পারে। তখন সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি প্রাণঘাতী সংক্রমণও হতে পারে।
এই ইনজেকশন অনেকটা শরীরকে বলে—
“চল, এবার একটু বেশি করে সাদা রক্তকণিকা তৈরি করা যাক।”
কেমোর কতক্ষণ পরে দিতে হয়?
এখানে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
সাধারণভাবে এই ধরনের ইনজেকশন কেমোথেরাপি শেষ হওয়ার অন্তত ২৪ ঘণ্টা পরে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ২৪–৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া হয়। তবে ঠিক কখন দিতে হবে, সেটা কোন ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং কী ধরনের কেমো হয়েছে তার উপর নির্ভর করে।
তবে অনেক রোগী আমায় প্রশ্ন করেন—“ডাক্তারবাবু, এটা আজই, মানে কেমোথেরাপির পরেই কি দেওয়া যায় না? আবার বাড়ি গিয়ে কাল ব্যবস্থা করতে হবে? তার চেয়ে আজই হাসপাতালে দিয়ে দিন না!”
আমার উত্তর হয়—না। কেমোর একই দিনে দেওয়া ঠিক নয়।
কেন?
কারণ কেমোথেরাপি তখনও শরীরের দ্রুত বিভাজিত কোষগুলির উপর কাজ করছে। এই সময় সাদা রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়াকে তাড়াতাড়ি বাড়িয়ে দিলে কেমোথেরাপির সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হতে পারে এবং কেমোর কার্যকারিতাও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সহজ কথায়—আগে কেমো তার কাজ করুক, তারপর শরীরকে নতুন সাদা রক্তকণিকা তৈরি করতে সাহায্য করা হোক।
তাই নিজের মতো করে সময় ঠিক করবেন না। আপনার চিকিৎসক যে সময় বলেছেন, সেটাই অনুসরণ করবেন।
কোথায় দিতে হয়?
এগুলো সাধারণত চামড়ার ঠিক নিচে দেওয়া হয়।পেটের চামড়া, উরু বা অন্য নির্দিষ্ট জায়গায় দেওয়া যেতে পারে। কোথায় দিলে সবচেয়ে ভালো হবে, তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার দরকার নেই। প্রশিক্ষিত নার্স বা চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী দিলেই হয়।
ওষুধটা কীভাবে রাখবেন?
এই অংশটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।ফিলগ্রাস্টিম বা পেগফিলগ্রাস্টিম সাধারণত ২–৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়।
ধরুন, আপনি আগের রাতে ওষুধটি কিনে আনলেন এবং পরের দিন ইনজেকশন দেওয়ার কথা। তাহলে ওষুধটি বাড়ির ফ্রিজে ২–৮°C তাপমাত্রায় রাখতে পারেন। সম্ভব হলে ফ্রিজের মাঝের তাকে রাখুন।
ডিপ ফ্রিজারে রাখবেন না। ফ্রিজারের চিলিং অংশেও রাখবেন না। সরাসরি বরফের সঙ্গে লাগিয়ে রাখবেন না।
আবার বাইরে ঘরের তাপমাত্রাতেও ফেলে রাখবেন না।
আর যদি ভুল করে ওষুধ কিছুক্ষণ বেশি গরম হয়ে যায় বা জমে যায়, নিজের সিদ্ধান্তে ব্যবহার করবেন না। কতক্ষণ এবং কীভাবে রাখা হয়েছিল সেটা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানান।
এর কি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?
হ্যাঁ, থাকতে পারে।
সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা হলো হাড়ে বা শরীরে ব্যথা।
অনেক রোগী আমায় বলেন—“ডাক্তারবাবু, কেমো দেওয়ার পর তো কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু এই পেগফিলগ্রাস্টিম ইনজেকশন দেওয়ার পর প্রচণ্ড গা, হাত-পা ব্যথা শুরু হয়েছে!”
আসলে এই ওষুধগুলো আমাদের অস্থিমজ্জায় কাজ করে। অস্থিমজ্জা হলো শরীরের সেই জায়গা, যেখানে রক্তের বিভিন্ন কোষ তৈরি হয়। এই ইনজেকশন সেখানে সাদা রক্তকণিকা তৈরির কাজ বাড়িয়ে দেয়।
স্বাভাবিকভাবেই সেই কারণে অনেকের হাড়ে বা শরীরে ব্যথা শুরু হতে পারে।
কখনও মাথাব্যথা বা ইনজেকশন দেওয়ার জায়গায় সামান্য অস্বস্তিও হতে পারে।
তবে সবার এমন হবে না এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো সামলানো যায়। অনেক সময় খুব তাড়াতাড়িই ব্যথা কমেও যায়।
আর “শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, প্যারাসিটামল ভরসা” তো আছেই!
তবে প্যারাসিটামল বা অন্য কোনো ওষুধ নেওয়ার আগে অবশ্যই নিজের চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
একটা কথা মনে রাখবেন—এই ইনজেকশন কিন্তু কেমোথেরাপির বিকল্প নয়। এটি কেমোথেরাপির পর শরীরকে সামলে উঠতে সাহায্য করার একটি সহায়ক চিকিৎসা। বরং ভাবুন—কেমোথেরাপি তার কাজ করেছে, আর এবার শরীরকে আবার শক্তি ফিরে পেতে একটু সাহায্য করা হচ্ছে।
তবে কোন রোগীর এই ইনজেকশন দরকার, কোনটি দরকার, কখন দিতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত রোগীর কেমোথেরাপি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি দেখে চিকিৎসকই নেবেন।
সব কেমোথেরাপির পর এই ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না।
তাই নিজে থেকে কিনে নিয়ে বা নিজের মতো করে সময় ঠিক করে এই ইনজেকশন নেবেন না।
তাই কেমোর পর এই ইনজেকশন পেলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কেমো তার কাজ করুক, ইনজেকশন তার কাজ করুক, আর আমরা?
ডাক্তারের কথা মেনে চলি, একটু ধৈর্য রাখি, আর শরীরকে সময় দিই।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ক্যান্সারের সঙ্গে—ইনজেকশনের সঙ্গে তো আর নয়!