15/05/2026
🌺👣🌼🌺👣🌼🌺👣🌼🌺👣🌼🌺👣🌼🌺
পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের ক্ষীরগ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা যোগাদ্যা।
বাংলার অন্যতম একটি সতীপীঠ হলো এই ক্ষীরগ্রাম। এখানে দেবী সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি পতিত হয়েছে। দেবী, রূপে মহিষাসুরমর্দিনী। দেবীর মূর্তি কষ্টি পাথরের তৈরী।
এখানে দেবী পাতালবাসিনী। মা যোগাদ্যার মূর্তিটি সারাবছর ক্ষীরদিঘির জলে নিমজ্জিত থাকে। বৈশাখী সংক্রান্তির সময় মায়ের আবির্ভাব দিবস। এছাড়া বিশেষ বিশেষ পুজোর সময় মাকে জল থেকে তুলে এনে চলে পুজো।
ক্ষীরগ্রামের পূজিতা প্রাচীন যোগাদ্যা মূর্তিটি কোনো কারনে হারিয়ে গিয়েছিল। আনুমানিক ২০০ বছর আগে, বর্ধমান মহারাজ কীর্তিচন্দ্রের নির্দেশে দাঁইহাটের নবীন ভাস্কর নতুন যোগাদ্যা মূর্তিটি তৈরি করেন। এই নবীন ভাস্কর হলেন তিনিই, যিনি পরবর্তীতে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের মা ভবতারিণীর মূর্তি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে ক্ষীরদিঘি সংস্কারের সময় পুরোনো মূর্তিটি পাওয়া যায়। বর্তমানে, পুরোনো মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি এবং নবীন ভাস্করের তৈরি নবীন মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি, দুটি ভিন্ন মন্দিরে পূজিত হয়। মায়ের মন্দিরটিও বর্ধমানের মহারাজ কীর্তিচন্দ্রের নির্দেশে নির্মিত। মন্দিরের তোরণটিও বেশ নজর কাড়ে ভক্তদের।
দেবী যোগাদ্যার ভৈরব হলেন ক্ষীর খন্ডক।
ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে বলা হয়েছে,
"ক্ষীরগ্রামে ডানি পার অঙ্গুষ্ঠ বৈভব৷ /
যুগাদ্যা দেবতা ক্ষীরখণ্ডক ভৈরব ৷৷"
অর্থাৎ, দেবী যোগাদ্যা ও ভৈরব ক্ষীরখণ্ডক।
পূজার নিয়ম নীতিতেও নানা প্রথা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, মা যোগাদ্যা উপাসনার একটি আশ্চর্য প্রথাও রয়েছে যা বর্তমানে অনুষ্ঠিত হয়, প্রথাটি পৌষ সংক্রান্তি থেকে মাঘ সংক্রান্তি অবধি চলে। এই প্রথার নাম 'নিশিঢম্বুল'। একজন ঢাকি চোখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় রোজ মধ্যরাতে মায়ের মন্দিরের গর্ভগৃহে বন্ধ দুয়ারের সম্মুখে ঢাকের বোল তোলেন এবং রত্নবেদীতে অধিষ্ঠিত মা যোগাদ্যা সেই ঢাকের তালে নৃত্য করেন। কথিত আছে, মায়ের পায়ের নূপুরের শব্দ শোনা যায়। মায়ের রত্নবেদীতে মা জাগ্রত আছেন---মূল মূর্তি নিমজ্জিত থাকলেও, ভক্তদের এই বিশ্বাস থেকেই এ প্রথা প্ৰচলিত।
দেবী যোগাদ্যার পূজার নিয়মগুলির মধ্যে আরেকটি অন্যতম নিয়ম হলো দেবীকে শাঁখা পরানো। এই নিয়মের কারণ হিসেবে ধরা হয় একটি জনশ্রুতিকে।
একবার এক শাঁখারী শাঁখা বিক্রির জন্য ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মন্দিরের দিকেই আসছিলেন। বর্তমান মন্দিরের পশ্চিম দিকে ধামীচদীঘি অবস্থিত। এই ধামীচদীঘির ঘাটেই এক সধবা নারী শাঁখারিকে ডেকে বলে তুমি কোথায় যাচ্ছ? শাঁখারি উত্তরে বলেন "শঙ্খ বেঁচিবার তরে যইছি ক্ষীরগ্রাম"। তখন ওই নারী বলেন, "ওখানে তোমার শাঁখা পরার কেউ নেই আগে আমায় শাঁখা পরাও তারপর যেখানে যাবার যেও।" শাঁখারি শাঁখা পরিয়ে টাকা চাইলে তখন ওই নারী বলেন "ওই যে দূরে মন্দির দেখছো, ওখানে আমার বাবা আছে, তাঁর কাছে গিয়ে বলো তার মেয়ে শাখা পরেছে, কোলঙ্গায় টাকা আছে যেন তোমায় দেয়।"
শাঁখারি মন্দিরে এসে পুরোহিত মশাইকে সব বলেন। পুরোহিত শুনে অবাক। পুরোহিত বলে, আমার তো কোন মেয়ে নেই, তাহলে কাকে শাঁখা পরালে তুমি ওই ধামীচির ঘাটে?
পুরোহিত মা যোগাদ্যার লীলা বুঝতে পেরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে ধামীচির ঘাটে। মাকে বলতে থাকেন "সারা জীবন তোর সেবা করলাম, তোর দেখা আমি পেলাম না। শাঁখারী কত পুণ্যবান সে তোকে শাঁখা পরিয়ে গেল, আমায় দেখা দিবি না মা?" মা যোগাদ্যা জলের মধ্যে থেকে দু হাত তুলে তার শাঁখা পরা হাত দেখায়। এরূপ জনশ্রুতি থেকেই মা যোগাদ্যাকে শাঁখা পরানোর নিয়ম।
দেবী যোগাদ্যাপূজার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নিয়ম কানুন আছে। যেমন-নিশিঢম্বুল, মাসি-পিসির ঝাঁপি, শাঁখা পরা, ক্ষীরদীঘি প্রদক্ষিণ প্রভৃতি। এই দেবীকে ঘিরে রয়েছেন অনেক পৌরাণিক কাহিনী ও জনশ্রুতি।
কবি কৃত্তিবাসের লেখনি থেকে আমরা দেবী যোগাদ্যার মর্তে আগমনের পৌরাণিক কাহিনীটি জানতে পারি। যা বহুল প্রচলিত। রামায়ণের যুগে যখন রাম-রাবণের যুদ্ধ চলছে তখন রাবণের পুত্র মহীরাবন, রাম ও লক্ষণকে তাঁর আরাধ্যা দেবী ভদ্রকালীর কাছে বলি দেওয়ার জন্য পাতালে বন্দি করেছিল। বলি দেওয়ার পূর্বে মহীরাবন, রাম ও লক্ষণকে বলেন তোমরা মা ভদ্রকালীকে ভূমিষ্ঠ হয় প্রণাম করো। তখন রামভক্ত হনুমান মাছির রূপ ধরে রামের কানে কানে শিখিয়ে দেয় যে বলুন "আমরা রাজার ছেলে প্রণাম করতে জানিনা আপনি আমাদের শিখিয়ে দিন"। এই বলে শ্রী হনুমান মা ভদ্রকালীর খড়্গের উপর মাছি রূপে গিয়ে বসেন। শ্রী রামচন্দ্রের কথা শুনে মহীরাবন মাথা নিচু করে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতে যায়। এই সুযোগে রামভক্ত হনুমান ভদ্রকালীর খড়্গ নিয়ে মহীরাবনকে বধ করেন। হনুমান, রাম ও লক্ষণকে সঙ্গে নিয়ে পাতাল থেকে বেরোতে উদ্যোগী হলে তখন মা ভদ্রকালী বলে--"তোমরা তো চলে যাচ্ছ আমাকে এখানে একা ফেলে গেলে তো হবে না। আমাকে পৃথিবীর মধ্যস্থল যেখানে, সেখানে নিয়ে চলো।" হনুমান সুড়ঙ্গ পথে রাম-লক্ষণকে কাঁধে ও মাথায় নিয়ে, মা ভদ্রকালীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এই ক্ষীরগ্রামে।
এরকম আরও অনেক কাহিনীর মধ্যেই এই দেবী যোগাদ্যার সাথে সর্বাধিক প্রচলিত যে জনশ্রুতিটি রয়েছে, সেটি হল ---
"যার ভয়ে পালাও মা তুমি, সেই মা যোগাদ্যা আমি"--- কথিত আছে একদা হরিদত্ত নামে এক রাজার সন্নিকটে দেবীর আগমনে শুরু হয় এই পূজা ৷ সপ্তাহব্যাপী মহাধুমধামের মধ্য দিয়ে চলে৷ কিন্তু অত্যাশ্চর্য ঘটনাটি হল তখন পূজা হত নরবলি দিয়ে৷ রাজা সমস্ত পরিবারের জন্য নিয়ম চালু করেন যে, বলির জন্য প্রত্যেক পরিবারের একজন সদস্য চাই প্রতি পূজায়৷ স্বভাবতই শোকচ্ছায়া নেমে আসে প্রজাবর্গের মধ্যে৷ নিয়মানুসারে একদিন এক ব্রাহ্মণীর পালা পড়ে, শোকগ্রস্ত ব্রাহ্মণী তার ছেলেকে নিয়ে ভোররাত্রিতে গ্রাম পরিত্যাগ করার চেষ্টা করে৷ কিন্তু পথমাঝে সেই ব্রাহ্মণীকে দেবী দর্শন দেন এক বুড়ির বেশে। দেবী ব্রাহ্মণীকে বলেন, এতো রাতে তোমরা কোথায় যাচ্ছ? ব্রাহ্মণী সব ঘটনা বর্ণনা করে বলে ওই রাক্ষসী দেবীর ভয়ে চলে যাচ্ছি নাহলে আমার ছেলেটাকেও খাবে। দেবী হেসে বলেন "যার ভয়ে পালাও মা তুমি, সেই মা যোগাদ্যা আমি"। মা আশ্বাস দিয়ে বলেন, যা তোর ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যা। আমি কোনো মায়ের কোল খালি করে নরবলি চাই না। দেবী যোগাদ্যার আশীর্বাদে তারা গ্রামে ফিরে আসে এবং নরবলির পরিবর্তে শুরু হয় মহিষবলি৷ এতসব পৌরাণিক কাহিনী, জনশ্রুতি, লোককথার মাঝেও দেবী যোগাদ্যা ক্ষীরগ্রামসহ সারা পৃথিবীর মাতৃভক্তদের কাছে সদা জাগ্রত।
জানা গিয়েছে, এই ক্ষীরগ্রামে একটা সময় বেশ কিছু চতুষ্পাঠী ছিল। মিলেছে বহু প্রাচীন পুঁথি। স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাদের দাবি, বেশ কয়েক জন পণ্ডিত এই গ্রামে বিদ্যাচর্চা করতেন। গবেষক যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী জানিয়েছেন, এই জনপদে অন্তত ৪০টি যোগাদ্যা বন্দনার পুঁথি মিলেছে। তবে তার মতে, সব থেকে আগে যোগাদ্যা বন্দনা লিখেছিলেন কবি কৃত্তিবাস।
আমার পাঠকবর্গকে এখনও অবধি যে যে তথ্য দিয়ে সতীপীঠ ক্ষীরগ্রাম ও মা যোগাদ্যা সম্বন্ধে যা জানাতে পারলাম, তাতে এটুকু বোঝা যায় যে বাংলার এই অন্যতম সতীপীঠ ক্ষীরগ্রাম ও মা যোগাদ্যা পূজা বাংলার তথা ভারতের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ধারক ও বাহক। এই ক্ষীরগ্রাম ও মা যোগাদ্যার নানা ঘটনাবলী, পূজার রীতিনীতি ইত্যাদি প্রাচীন ইতিহাস গবেষকদের কাছে খুবই মূল্যবান।
🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺