13/07/2022
গুরু
ওঁ অখন্ড মন্ডলা কারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম।
তদপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ ।।
অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া।
চক্ষুরুন্মিলিত যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ ।।
গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর।
গুরু রেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ ।।
গুরু পূর্ণিমা ( गुरु पूर्णिमा ) :-
হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য মতে পালিত একটি উৎসব, যাতে "গুরু পূজা" সম্পন্ন করা হয়। 'গুরু' শব্দটি 'গু' এবং 'রু' এই দুটি সংস্কৃত শব্দ দ্বারা গঠিত; 'গু' শব্দের অর্থ "অন্ধকার" / "অজ্ঞতা" এবং 'রু' শব্দের অর্থ "যা অন্ধকারকে দূলীভূত করে"। অর্থ্যাৎ, 'গুরু' শব্দটি দ্বারা এমন ব্যক্তিকে নির্দেশ করা হয় যিনি অন্ধকার দূরীভূত করেন। হিন্দু বিশ্বাস মতে, এই দিন 'মহাভারত' রচয়িতা মহির্ষি বেদব্যাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুণি পরাশর ও মাতা সত্যবতীর ঘরে; ফলে এই দিনটিকে কখনো
কখনো 'ব্যাস পূর্ণিমা'-ও বলা হয় ।
অনেকের মনে এই প্রশ্নটি থাকে যে গুরু কে ?
গুরুকরণ করার প্রয়োজনীয়তাই বা কি ?
গুরু ছাড়া কি সেই উদ্দেশ্য সফল হয়না যা গুরু থাকলে হয় ? ইত্যাদি।
আমি এ বিষয় কিছু সহজ উদাহরন দিয়ে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। শুরুতেই বলে রাখি যারা আমার লেখা পরেছেন জানেন। কিন্তু যারা নতুন পরছেন
তাদের উদ্দেশ্যে বলি যে আমি বিরাট জ্ঞানী বা যোগী সাধকগনের জন্যে লিখিনা। কারন আমি নিজে তা নই। আর আমার তাদের ন্যায় অপার জ্ঞান ও নেই। আমি লিখি জনসাধারনের জন্যে। যারা সেই অর্থে আধ্যাত্মিক জগতের রসাস্বাদন করতে পারেননি। সাধক যোগী পন্ডিতগণতো সেই রস পেয়েইছেন। আমি আর তাদের কি জানাব। বরং আমারি জানা বাকি আছে। আমিও জ্ঞানের সন্ধানী। সত্যজ্ঞানসন্ধানী। কিন্তু আমি সাধারন মানুষদের কাছে সরল আলোচনার মাধ্যমে তাদেরও এই সুন্দর জগতটির প্রতি একটু আকর্ষন জন্মে তুলতে সহায়তা করতে চাই। কারন আমি নিজে জানি যে এই জগত সত্যের জগত। আর সত্যকে জানা প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। তাই যারা আধ্যত্মীক বইগুলিকে ভাষা উদ্ধারের অসুবিধায় দূরে সরিয়ে রাখে, না বুঝে বলে এই জগত বয়স্কদের জন্যে তাদের বোঝাতে চাই তা সত্য নয়। সত্যটাকে দেখুন। কারন সত্যই শিব। আর শিবই সুন্দর। সত্যম শিবম সুন্দরম।
ছাত্রাবস্থায় আমাদের শিক্ষকের প্রয়োজন হয়।
শিক্ষক কে ?
জিনি সেই বিষয় আমার অধিক পড়াশোনা করেছেন এবং যাঁর অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে অধিক। আমি তখন ছাত্র। তিনি শিক্ষক। এই শিক্ষক সেক্ষেত্রে আমার গুরু।
শিক্ষাগুরু।
এই শিক্ষা কিসের ?
সেই বিষয়ের।
ধরি আমি অঙ্কের শিক্ষক রাখলাম। তিনি অঙ্কটা অন্তত আমার চেয়ে বেশি জানেন। তাই তিনি সেখাতে পারছেন আর আমি শিখতে যাচ্ছি তার কাছে। মানে এই গুরু বিশেষ কোন বিষয় শেখাচ্ছেন। ঠিক তেমনি যে শিক্ষক আমাদের আধ্যাত্ম জগতের শিক্ষা দেন, যিনি আমাদের চেয়ে সেই শিক্ষায় অনেক বেশি জ্ঞানী, তিনিই গুরু। বিষয় আধ্যাত্মীকতা।
তাহলে প্রশ্ন হল, সাধারন বিষয়গুলি যা স্কুলে পড়ান হয়েথাকে সেগুলির শিক্ষক যেমন প্রচুর আছে,
এই শিক্ষক অর্থাৎ গুরু সেই তুলনায় কম কেন ?
আর সেই শিক্ষা কি এইসব বিষয়গুলির থেকে বেশি কঠিন ?
উত্তর হল ধরি যেকোন একটি বিষয় যেমন ইংরাজী। এখন এই বিষয়টির ওপর যদি আপনাকে মাস্টার ডিগ্রি করতে হয় আপনাকে কত বছরের অধ্যাবসায় এর পেছনে খরচ করতে হবে ভেবে দেখুন তো ?
২ বছর ?
না।
৫ বছর ?
তাও না।
কারন আপনি শুধু স্নাতক এবং মাস্টার এই দুটির
হিসাব করলে হবেনা।কারন তার আগে আপনি যদি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাশটা না করতেন তাহলে এগুলি সম্ভব হত না।তার আগের ক্লাসগুলির ক্ষেত্রেও কিন্তু তাই। তারমানে আপনি যদি ক্লাস ১ থেকে ধরেন তাহলে ১৭বছর লাগল আপনার এই ডিগ্রী পেতে। আর এই বছরগুলিতে যদি শুধু ইংরাজী শিক্ষকের কথাই ভাবেন তাহলে ভেবে বলুনতো কজন শিক্ষক শিখিয়েছে ইংরাজি আপনাকে ?
হয়েতো এখন গুনে সাথে সাথে বলতেও পারবেন না।
তাহলে ভেবে দেখুন যে একটি বিষয়,
যা একটি বিশেষ ভাষা এবং যা মানুষেরই সৃষ্টি তা শিখতেই যদি আপনাকে এতগুলো বছর দিতে
হয়, এতজন শিক্ষকের সম্মুখিন হতে হয় তাহলে সেই জ্ঞান, যা সয়ং পরমাত্মার জ্ঞান, যা সাধারন মানুষের ধারনারও বাইরে সেই জ্ঞান লাভ করে যিনি গুরু
হয়েছেন তিনি কতটা শিক্ষিত।
ভেবে দেখুন সেই জ্ঞান শিক্ষা পেতে কত বছর
লাগতে পারে ? হয়েত এক জীবনেও সেই জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। যে বিষয়টি এই বিশ্বব্রম্ভান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছে তা জানতে কতবছর লাগতে পারে ?
ভেবে দেখুন।
আর এবিষয়টি নিয়ে যদি জানতে চান তাহলে কোন শিক্ষক ছাড়া শিখতে পারবেন তা কি সম্ভব ?
আরেকটি উদাহরন দিচ্ছি। ধরুন আপনাকে কোন একটি স্থানের কোন এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে হবে। ধরুন তার বাড়ি আপনার চেনা এলাকাতেই। তাহলে তাকে খুঁজে বের করতে আপনাকে বেশি বেগও পেতে হবেনা। হয়েতো পথে কাউকে জিজ্ঞাসানা করেই আপনি তাকে খুজে বের করতে সক্ষম হলেন। এবার ভেবে দেখুন সেই বাড়ি অন্য কোন লোকালয়। আপনাকে ট্রেনে বাসে সেই স্থানে পৌঁছে তাকে খুঁজতে হবে।
আপনি তখন ট্রেন বা বাস থেকে নেমে কাউকে সেই স্থানের ঠিকানা জানতে চাইলেন। মানে আপনি যখন একটু দূরে গেলেন যা আপনার পরিচিতির বাইরে তখন আপনি সেই স্থান সম্পর্কে আপনার জ্ঞানের সল্পতার কারনে একজন স্থানীয়ের সাহায্য নিলেন। যার সাহায্য নিলেন সে সেই স্থান সম্পর্কে অবগত হলে আপনাকে সেই স্থানের নির্দেশ দেখিয়ে দিল। আপনিও পৌঁছোলেন।
এভাবে যদি আপনাকে দূর দেশে যেতে হলে তখন দেখবেন পথে পথে অনেকক্ষেত্রেই আপনার অজানার কারনে আপনাকে অনেকেরই সাহায্য নিতে হচ্ছে। কোথায় যাব, কোথা দিয়ে যাব, কোন বাস বা ট্রেন ধরব ইত্যাদি ইত্যাদি। জ্ঞানের মানের গন্ডী কমতে থাকলেই সাহায্যের প্রয়োজনও বেরে যায়।আবার উলটো দিকদিয়ে ভাবলে আপনি যার সাহায্যপ্রার্থী তাকেও কিন্তু সেই বিশয় অবগত থাকতে হবে।তবেই সে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে। যাত্রার দুরত্ব যত বৃদ্ধি পাবে ততই এই সাহায্যের প্রয়োজন বারবে।
এবার ভাবুন, যে স্থানটি এই পৃথিবিরই মধ্যে রয়েছে আপনার থেকে কিছুটা দুরেই সেইখানে যেতেই যদি আপনার সাহায্য লাগে জানার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, তাহলে যে স্থান এসবের উর্দ্ধে, সেখানে যেতে আপনি কিভাবে ভাবছেন কারও সাহায্য ছাড়াই পৌঁছোতে পারবেন?
সেই পথের আপনি স্বরুপ বা অবস্থান কিছুই
যানেন না। কোথাদিয়ে কিভাবে যাবেন তাও ঠিক জানা নেই। তাহোলে ?
এই স্থলে আপনাকে সেই মানুষটিই সাহায্য করতে পারেন যিনি সেই রাস্তা সম্পর্কে অবগত। আর তা বুঝতেই পারছেন যেকোন মানুষেরই চেনার কথা নয়। কারন সাধারন জ্ঞানে তা জানার কথাও নয়, কারন তার জন্যে লাগে বিশেষ শিক্ষা, উচ্চস্তরের অধ্যাবশায় ও অনুশীলন। আর সেই শিক্ষা দিতে পারেন, আপনাকে সেই পথের সন্ধান যিনি বলতে পারেন, সেই স্থান সম্পর্কে যিনি অবগত তিনিই হলেন গুরু। আশা করি
গুরুর আবশ্যকতা সম্পর্কিত প্রশ্নটি কিছুটা হলেও সমাধান হতে পারবে।
গুরু কে জান ?
ব্রম্মই গুরু।
তবে মানুষকে আমরা গুরু বলে মানি কেন ?
ধর পথ দিয়ে তুমি যাচ্ছ হঠাৎ গর্তে পড়ে গেলে, যাকেই দেখতে পাচ্ছ তাকেই বলছ তোমাকে তুলে দিতে , কেউ তোমাকে তুলছে না ।
এমন সময় একজন এসে বলল –
আমি তোমাকে তুলে দিব কিন্তু আমাকে বাপ্ ডাকতে হবে। তুমি বললে সে কি ?
আমার যে একজন বাপ্ আছে । এই পথের শেষটায় তার বাস , তিনি থাকতে তোমাকে বাপ্ ডাকব কেন ?
সেই লোক বললেন - ওসব মানি না ,
আগে বাপ্ ডাক পরে তুলব ।
অগত্যা তুমি বাপ ডাকলে । তখন লোকটি তোমকে তুলে দিলেন এবং পিতৃসম্মোধনে স্নেহমুগ্ধ হয়ে তোমার হাতে একটি লাঠি দিয়ে বললেন –অন্ধকারে চলতে এই
লাঠিখানা দিয়ে পথ ঠিক করে নিও , তাহলে আর গর্তে পড়বে না । তখন তুমি এই লাঠি নিয়ে পথ চলতে থাকলে । গুরু - শিষ্য ও এই রকম । পথে না উঠা পর্যন্ত
গুরু শিষ্যে সমন্ধ ,পথ পেলে যত সমন্ধ ঐ পরমগুরুর সঙ্গে ।।
নিঃশর্তে গুরু সেবার শর্তে গুরু ধারণ করতে হয়। তাই শিষ্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য - গুরু সেবা। অন্যান্য সকল দায়িত্ব ও কর্তব্যও গুরু সেবার অন্তর্ভুক্ত।
গুরু সেবা অর্থ গুরু আদর্শ ধারণ ও কর্মের মাধ্যমে
লালন-পালন। নিরাকারের সেবা করা যায় না। সেবা করা করা যায় আকার জীব বা জড় বস্তুর।
গুরু যখন আকারে বর্তমান নেই তখন সকল আকারই তাঁর। শিষ্যের কাছে গুরু কখনো নিরাকার নন।
গুরু সেবা পদ্ধতি অনেক। যে যেদিকে যোগ্যতা অর্জন করেছে সেদিকে অথবা গুরু কর্তৃক নির্বাচিত পথে ভক্তির সাথে বিরামহীন কর্ম চালিয়ে যাওয়া গুরু দায়।
এ কাজের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। শিষ্য সাঁতার শিখতে চায় গুরু শিষ্যকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন নদীতে। শিষ্য হয় সে-ই যে সাঁতার শিখে নদী থেকে পাড়ে
ওঠে। সবাই শিষ্য হয় না।
কেউ কেউ এক/দুইবার পানিতে ঝাপটিয়ে ওঠে যায়, কেটেপড়ে গুরুর উপর দোষ চাপিয়ে।
আবার আসে, আবার যায় কিন্তু সাঁতার শেখার জন্য
যে চারিত্রিক বলিষ্ঠতা ও দৃঢ়তার প্রয়োজন তা অর্জন করতে পারে না।
বাহ্যদৃষ্টিতে গুরু খুবই নিষ্ঠুর। গুরুর কাছে শিষ্য জ্ঞান চায়, গুরু শিষ্যকে জটিল সমস্যা সমাধান করতে দেন।
শিষ্য হতচকিত হয়ে যায়,
‘এ কাজ আমি কি করে করবো?
আপনি জানেন না আমি করতে পারি?
এতোটা নির্দয় হলেন কী করে?’ -
এসব প্রশ্ন জাগে শিষ্যের মনে। কিন্তু একরৈখিকতায় সমস্যার সমাধান করতে করতে শিষ্য জ্ঞানী হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে গুরুর নিষ্ঠুরতা দেখে যে পালিয়ে যায় সে মূর্খতার অন্ধকারেই পতিত থাকে সারাজীবন।
ক্ষুধার্থ নেকড়ের পালে ভেড়ার যে অবস্থা হয় অনেক সময় জেনে-শুনে-বুঝেই গুরু শিষ্যকে সে অবস্থায় ফেলে দেন। কীভাবে নেকড়ের পাল থেকে নিজেকে রক্ষা করে
গুরু সেবায় এগিয়ে যাবার সাহসিকতা অর্জন করতে হয় তা নেকড়ের পালে না পরলে ভেড়া শিখতে পারে না।
এটা গুরুর নিষ্ঠুরতা নয় - করুণা। যারা খুব সহজে
গুরুর করুণাধারায় সিক্ত হতে চায় তারা বিভ্রান্তিতে পতিত। সহজে যা পাওয়া যায় তা অতি মূল্যবান হলেও কোন মূল্য থাকে না মানুষের কাছে। কোন বাধা-বিপত্তি ছাড়া যদি আরামদায়ক কোন পথে গুরু শিষ্যকে চলতে দেন তবে শিষ্য অলস ও অথর্বে পরিণত হবে, তার জীবনীশক্তিগুলো বিকশিত তো হবেই না বরং ধীরে
ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। বাহ্য দৃষ্টিতে শিষ্য গুরুর কাছে যা চায় তা পায় না।
গুরু শিষ্যের জন্য যা প্রয়োজন তা-ই দিয়ে থাকেন।
গুরু রাস্তায় পাথর রেখে ঝোপের আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেন তার কোন্ শিষ্য কি করে। কোন কোন শিষ্য পাথরকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়. কোন কোন শিষ্য
চিৎকার করে অকথ্য ভাষায় মা-বাপ তুলে গালি দেয় - ‘পথের মধ্যে কোন্ বেয়াকুফ এত বড় পাথর রাখলো’?
গুরু অপেক্ষা করতে থাকেন নিরুদ্বেগে। হঠাৎ এমন একজনের আবির্ভাব ঘটে যে পাথরটির কাছে দাঁড়িয়ে বলে ‘হে গুরু! এই ভারী পাথরটি সরানোর শক্তি দাও। তুমিইতো আমার শক্তিদাতা।’
গুরুর শক্তিতে শক্তিমান হয়ে শিষ্য চলার পথ থেকে পাথর সরিয়ে রাখে আর কৃতজ্ঞতায় সেজদায় লুটিয়ে পড়ে গুরুর চরণে। গুরু সেই শিষ্যকেই মনোনীত করেন তার প্রতিনিধি হিসেবে। শিষ্য গুরু-ত্ব পূর্ণ হয়ে ওঠে। দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালনের পর অধিকার চাইতে হয় না, প্রাকৃতিক বিধানে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলতেন, “আদবে আউলিয়া বিয়াদবে শয়তান”। সূফীতত্ত্বে গুরুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন সর্বোচ্চ আসনে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও যেন গুরুর প্রতি বিন্দুমাত্র অসম্মান প্রদর্শিত না হয়। গুরুর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান না থাকলে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করা যায় না। গুরুর সান্নিধ্য প্রার্থীআদব প্রদর্শনে যত বেশি সজাগ থাকবে সে তত দ্রুত সফলকাম হবে।
গুরুর দিকে একনিষ্ঠ থাকা, গুরুর হুকুম অনুসারে তাঁর সম্মুখে কথা বলা বা খাওয়া, তাঁর সম্মুখে থাকাকালীন সময়ে তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীগুলো স্মৃতিপটে ধরে রাখা,
সম্মতি দিলে নিজের প্রার্থনা সংক্ষেপে পেশ করা নচেৎ চুপ থাকা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা ও মতামত প্রকাশ থেকে বিরত থাকা, গুরুর দরবারে যে কাজইদেয়া হোক না কেন তা আন্তরিকতার সাথে সুচারুরূপে সম্পন্ন করা, যে কোন ব্যাপারে গুরুর সম্মুখে ওয়াদা করলে তা পালন করা এবং পালনে অক্ষম হলে ক্ষমা চাওয়া, তিনি যেদিকে বসেন বা দাঁড়িয়ে থাকেন সেদিকে পিছন ফিরে না দাঁড়ানো ও না চলা, তাঁর সমীপে যে ফরিয়াদ বা আর্জি পেশ করা হয় তা অন্য কারো কাছে না বলা, গুরুর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা, তিনি বসা থেকে উঠে
দাঁড়ালে উঠে দাঁড়ানো এবং যতক্ষণ তিনি না বসেন ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, পারস্পরিক পার্থিব কোন কথাবার্তা না বলা, তাঁর সম্মুখে মাথা নত করে নিচু
স্বরে কথা বলা, তাঁর ব্যবহৃত কোন জিনিস ব্যবহার না করা, সর্বক্ষেত্রে আচার-আচরণে ভদ্রতা রক্ষা করা, গুরু কোন ব্যক্তির প্রতি রূঢ় ব্যবহার করলে সে দিকে দৃষ্টি না দেয়া ও মন্তব্য না করা, গুরুর কাছে অন্যের জন্য
সুপারিশ না করা, তাঁর হুকুমে দরবার ত্যাগ করার সময় যতুটুকু পারা যায় তাঁর দিকে দৃষ্টি রেখে পিছু হেঁটে দরবারের বাইরে আসা, ভ্রমণকালে তাঁর আগে গাড়িতে উঠা, বসা, খাওয়া বা ঘুমানো থেকে বিরত থাকা, তাঁর সম্মতি অনুসারে চলা - ইত্যাদি শিষ্যের আচরণগত দায়িত্ব ও কর্তব্য।
শিষ্য যতক্ষণ গুরুর সামনে থাকে ততক্ষণ সকল শক্তিকে কেন্দ্রীভূত রাখতে হবে গুরুর প্রতি। গুরু বাণী মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা শিষ্যের কর্তব্য।
পৃথিবীতে যত ধর্মশাস্ত্র আছে তার সবই গুরু শিষ্যের সংলাপ। কোন কোন গ্রন্থে শিষ্যের প্রশ্নকে উহ্য রাখা হয়েছে, উহ্য রাখা হয়েছে প্রেক্ষিত।
আবার কোন কোন গ্রন্থে প্রশ্ন ও উত্তরের সন্নিবেশ ঘটেছে। যার গুরু আছে গুরু বাণীই তার কাছে শাস্ত্র। অন্য কোন শাস্ত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা তার নাই। তাই গুরুর কথার উপর কোন কথা বলতে নেই। কখনও গুরুর কথা কেটে দিতে নেই। গুরু নিজে উত্থাপন না করলে বহিঃজগতের কোন আলোচনা উত্থাপন করতে নেই। গুরুর কাছে কোন গুরু ভাই সম্পর্কে অভিযোগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গুরুর একটি অতি সাধারণ কথাকেও শিষ্যকে গ্রহণ করতে হবে চূড়ান্ত বিধান হিসেবে।
গুরু উদ্দেশ্য ব্যতীত কোন কথা বলেন না। শিষ্যের পক্ষে সবসময় তা অনুধাবন করা সম্ভব নাও হতে পারে। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে পরবর্তীতে গুরু বাণী
নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে রহস্য উন্মোচিত হবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত শিষ্য নিজের ইচ্ছাকে গুরুর ইচ্ছায় পূর্ণ সমর্পন না করতেপারবে ততক্ষণ পর্যন্ত গুরু জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। গুরুর করুণা না থাকলে কেবল শিষ্য নিজে চেষ্টা করে গুরু জ্ঞান লাভ করতে পারবে না।
শিষ্য ততটুকুই জানে যতটুকু গুরু তাকে জানতে দেন। গুরুর করুণা ব্যতীত আত্মশুদ্ধিও সম্ভব নয়।
আত্মশুদ্ধির নিমিত্ত হচ্ছেন গুরু, গুরুর প্রয়োজনীয়তাও এজন্যই। মানুষ বড়ই অসহায় একা একা মানুষ কিছুই করতে পারে না। গুরু চিন্তা ব্যতীত চিন্তাজগত শুদ্ধতা লাভ করতে পারে না। কারণ চিন্তা নিজে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না, এজন্য প্রয়োজন গুরুর অবস্থান। কীভাবে চিন্তা নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে যখন সে কোন এক বিষয়ে ২ মিনিটও স্থির রাখতে পারে না! চিন্তা পরিশুদ্ধ না হলে কর্ম পরিশুদ্ধ হয় না। তাই চিন্তা জগতে গুরু স্থায়ী ও স্থির না হওয়া পর্যন্ত শিষ্য শুদ্ধ হয় না।
শিষ্য একক চেষ্টায় গুরুকে তার চিন্তার জগতে স্থির করতে পারে না যদি না গুরুর করুণা থাকে। গুরু জানেন কীভাবে অস্তিত্বের গভীর থেকে শিষ্যের চিন্তা জগতে পরিবর্তন আনতে হয়।
প্রেমময়ী মায়ের মতো গুরু