23/09/2022
ভালবাসা মানে নিজের অহম বোধের মধ্যে অন্যের অহম কে যত্নে স্থান দেওয়া । মানে আমি আর আমি যাকে ভালবাসি - এই দুই ব্যক্তি মিলে এক ব্যক্তি হওয়া । একজনের ব্যথা লাগলে অন্যেরও ব্যথা লাগবে, একজনের আনন্দ হলে অন্য জনেরও আনন্দ হবে । একজনের অপমান অন্যজনেরও অপমান , একজনের সম্মান অন্য জনের সম্মান । অন্যকে sympathy দেখানোর নাম ভালবাসা নয় । আমার পরিচিত একজন স্বামী গর্ব করে তার স্ত্রীকে প্রায়ই বলে থাকেন যে আমি তোমাকে যতটা ভালবাসি ততটা এই পৃথিবীতে তোমার মা ছাড়া আর কেউ ভালবাসে না । স্ত্রী অবাক হয়ে শোনে, মুচকি হাসেন কিন্তু আমি কখনো তাকে এই কথার কোন উত্তর দিতে দেখিনি, হয়তো মনে মনে ভাবেন যে, অন্য লোক আমাকে ভালবাসবেন কেন ? কার কি দায় পড়েছে আমাকে ভালবাসবার? ভালবাসাতো তৈরি হয় একসাথে জীবন যাপনে , একসাথে ঘাম ঝড়িয়ে, একে অপরকে শ্রদ্ধা করে, একজনের অনুচ্চারিত কষ্ট বুঝে তার বোঝা বহন করে, একজনের দূর্বলতাকে গ্রহণ করে তাকে সবলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে, তার সামগ্রিক অস্তিত্বে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে - আর এ সবের জন্য তো সময় দরকার । আমি তো শুধু মাত্র অফুরন্ত সময় নিয়ে তোমার কাছেই আমাকে মেলে ধরেছি , অফুরন্ত সময় নিয়ে তোমারই প্রেমে পড়েছি , আর তো অন্য কাউকে সেই সময় দিই নি । তাহলে কেন অন্য মানুষ আমার স্বামীর সঙ্গে আমাকে ভালবাসার প্রতিযোগিতা করতে আসবেন ? কিন্তু এত কথা স্ত্রী তার স্বামীকে বলেন না । কারন তিনি তার বোধ দিয়ে বুঝতে পারেন, যে স্বামী ভালবাসার আস্ফালন করেন তার আর যাই কিছু যোগ্যতা থাকুক ভালবাসবার যোগ্যতা তৈরি হয়নি । ভালবাসতে গেলে অন্যের কাছে নিজেকে উজার করে দিতে হয় ।
হ্যা ঠিকই বলছি, ভালবাসা দেওয়া বা অন্য মানুষ কে ভালবাসা আসলে একটা যোগ্যতা যা জন্ম থেকেই ধীরে ধীরে মানুষকে অর্জন করতে হয় । জন্মের মুহূর্ত থেকে মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষা এবং নিজের চাহিদা পূরণের ব্যস্ত । নিজেকে ভালবাসলে যেমন নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয় তেমন অন্যকে ভালবাসলেও তার অস্তিত্ব নিজের অস্তিত্বর মতোই দামি হয় । এই বোধের জন্য জীবন বোধের শিক্ষা লাগে । আমাদের সমাজে তা বিরল ।
আমাদের সমাজে বাবা ও মায়েরা সন্তানকে শুধু মাত্র যেন তেন প্রকারে টাকা পয়সা রোজগারের skill শেখায় । এবং এটা শেখায় যে তুমি যদি টাকা রোজগার না করতে পারো তাহলে তোমার অস্তিত্ব সংকটে । ফলে নতুন প্রজন্ম অস্তিত্বের সংকটে ভোগে, এবং সব সময়ই অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় জীবন কাটায় । প্রতি মুহূর্তে আমি কতটা পেলাম তার একটা অসমাপ্ত হিসেব কষে যায় । কিন্তু সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে তো হারাতে হয় । হারতে হয় । সহ্য করতে হয় । সেটা কজন শেখে । যেমন স্বামী হয়তো কর্মক্ষেত্রে হয়রানি শিকার হয়ে মেজাজ হারিয়ে বাড়িতে ফিরেছে, স্ত্রী দরজা খুলতে দেরী করায় সমস্ত বিরক্ত টা স্ত্রীর ওপর গিয়ে পড়ল । এখন স্ত্রী বিরক্তি টা সহ্য করতে না পেরে যদি সেও মুখ ঝামটা দেয় তো ঝগড়াই হবে । আবার স্ত্রী যদি খানিক চুপ থাকে তবে এমনটাও হতে পারেঃ-
স্বামী : কি কর সারাদিন বাড়িতে বসে ? কখন থেকে বেল বাজাচ্ছি, ঘুমোও নাকি ???
স্ত্রী খানিক বাদে যখন স্বামী হাত পা ধুয়ে খেয়ে শান্ত হয়ে বসেছে তখন কাছে বসে গায়ে হাত বুলিয়ে বললঃ কি গো ? একটু বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে , রাস্তায় বা অফিসে কিছু সমস্যা হয়েছে ? কোন কারনে কি মন খারাপ ?
স্বামী তখন এই সহমর্মিতায় আরো শান্ত হবে এবং মনের জ্বালা শান্ত হবে ।
আরেকটা উদাহরণ: স্ত্রীকে হয়ত তার শাশুড়ি মানে স্বামীর মা কিছু ভাবে ভুল কারনে তিরস্কার করেছেন আর স্ত্রী মনোকষ্টে ভুগছেন, সেই সময় অনেক স্বামীই স্ত্রীকে বোঝাতে যান যে কেন তার মা এমন বলেছেন - মা আসলে এমন ভাবে তোমাকে বলেন নি , তুমি ভুল ভাবছ ইত্যাদি কিন্তু তার বদলে স্বামী এত বকবক না করে যদি নিঃশব্দে স্ত্রীকে জড়িয়ে বুকে কাছে টেনে নিয়ে একটু আদর করে দিয়ে বোঝান যে স্ত্রীর মনের কষ্ট যেন তিনিও অনুভব করছেন তাহলে হয়তো স্ত্রীর কষ্টের প্রশমন তাড়াতাড়ি হবে ।