10/09/2026
সুইসাইড শুধুমাত্র মেডিকাল ইস্যু নয়, এর সাথে জড়িত আছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি কমিউনিটি।তাই সুইসাইড প্রিভেনশান বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ভাবে হতে হবে কোনও একপাক্ষিক পরিকল্পনা এখানে কার্যকরী নয়!
*আপনি কী করতে পারেন?*
ব্যক্তিগত স্তরে-
খুব সক্রিয়তার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করা, কোনও সুইসাইডাল ভাবনা আসছে কিনা! কোনও প্ল্যান আসছে কিনা! যদি আসে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্যের কথা বলা উপযুক্ত জায়গায় চিকিৎসার জন্যে নিয়ে যাওয়া।
প্রত্যেকে WHO নির্ধারিত গেট কিপার ট্রেইনিং প্রোগ্রাম(Gate Keeper Training Program), সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড ট্রেইনিং(Psychological first Aid) প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলে ও দক্ষ হয়ে উঠলে এই জায়গায় কীভাবে কথা বলতে হয় ও কী সিধান্ত নিতে হয়, বা কী করণীয় তা সম্বন্ধে সঠিক ধারণা তৈরি হয়!
প্রয়োজনে কোনও হেল্পলাইন নাম্বারে যুক্ত হওয়া বা নিজের অবসর সময়ে সেখানে সময় দেওয়া!
যা কখনই করব না!-
যদি কোনও ব্যক্তি কোনও মানসিক রোগের কারণে নিয়মিত ওষুধ খান, তাকে ওষুধ খেতে বারণ করব না!
কেউ সুইসাইড করার কথা বললে তাকে চ্যালেঞ্জ করব না! কেউ কখন সুইসাইড করার কথা বললে, বলব না- “তুই শুধু বলিস! করবি তো না! অত দম তোর নেই!” কিম্বা ‘অ্যাটেনশান পাওয়ার জন্যে এসব করছিস তুই’ এইসব বলব না।
যে সুইসাইড আটেম্পট করেছেন তাকে আলাদা করে স্টিগমাটাইস করব না! সেক্সুয়াল মাইনরিনিটি, জেন্ডার মাইনরিটি কিম্বা আর্থিক ভাবে দুর্বল বর্গের অথবা অন্য হাই রিস্ক পপুলেশানের লোকজনকে সবসময় বেশি কেয়ার নিয়ে কথা বলা উচিত!
কখনই নিজের ছেলেমেয়েদের অন্যদের সাথে তুলনা করব না! বিশেষ করে পড়াশুনায় পারফর্মেন্সের ক্ষেত্রে! তুলনা করার মানে হল আপনি একজন মানুষকে ইন্সাল্ট করছেন তাকে অযোগ্য প্রমানের চেষ্টা করছেন! বরঞ্চ তাকে জীবনে বিভিন্ন চ্যলেঞ্জের জন্যে প্রস্তুত করুন! জীবনের প্রথম দিকে তাকে সাপোর্ট করুন! পরীক্ষার আগে তাকে পাশ করলে এই গিফট দেব যেমন বলি! তেমনই ফেল করলে কী হবে, রেসাল্ট খারাপ হলে কী হবে, তার বন্ধু ফেল করলে কীভাবে কথা বলবে ওর সাথে! এই সব বিষয়েও শিক্ষা দেওয়া বাঞ্ছনীয়! ঠিক তেমনি নিজের বয়স্ক বাবা মায়ের সাথে রোজ যোগাযোগ রাখা খুব জরুরি!কারণ ছেলে মেয়ে এবং বয়স্ক দুজনের মধ্যেই সুইসাইডের প্রবণতা বেশি!
জীবনে কখন একা হয়ে যাবেন না! যোগাযোগ রাখুন লোকজনের সাথে, জীবনে খুব অল্প হলেও কয়েকটি সম্পর্ক যত্ন ও সময় নিয়ে গড়ে তুলুন! যে সম্পর্কগুলো আপনার মেন্টর হয়ে উঠবে!
কমিউনিটি লেভেল
কৃষক আত্মহত্যা ভারতে এখন জ্বলন্ত ইস্যু! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্থিক চাপে পড়ে সন্ধ্যে কিম্বা রাতের দিকে কীটনাশক ওষুধ খেয়ে মারা যাচ্ছিলেন তারা!একে বন্ধ করার জন্যে কিছু প্রোগ্রাম নেওয়া হয়! ‘পেস্টিসাইড ব্যাঙ্ক’ বলে একটি প্রোগ্রাম চালু হয় যেখানে গ্রামের সমস্ত কৃষকের পেস্টিসাইড এক জায়গায় এনে রাখা হয়! যেখান থেকে রোজ সকালে প্রয়োজন মতো সবাই নিয়ে যেতে পারবেন না! এতের দেখা যায় সুইসাইড রেট কমছে!
মাইক্রো-ফিনান্সিং(সাময়িক অর্থ সাহায্য) খুব জরুরি হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে! বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্য থেকে তাঁদের দূরে রাখা! যেকোনো ডাটা ঘাটলেই বোঝা যাবে যে যারা সুইসাইড করছেন তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই নেশা জাতীয় দ্রব্য রোজ ব্যবহার করতেন!
কমিউনিটি লেভেলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচার চালানো! সাহায্য চাওয়া মানেই যে দুর্বল হয়ে পড়া নয়, ‘পাগল হয়ে যাওয়া নয়’ তা লোকজনকে বোঝানো! সঠিক ভাবে নুন্যতম কাজের মজুরি ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নীতি প্রণয়ন করানো!
প্রতিটি স্কুল কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে আলাদা করে সুইসাইড প্রিভেনশান প্রোগ্রাম চালু করা! লাইফ স্কিল ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করানো! স্কুল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়! এখানে প্রতিটি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদেরও উপযুক্ত ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা আশু প্রয়োজন!
১৪০ কোটির দেশে সবাইকে ব্যক্তিগত স্তরে সাহায্য করা খুব কঠিন একটি কাজ! তাই পিয়ার টু পিয়ার (Peer to Peer)সংযোগ স্থাপন করে এই সাপোর্ট করা যেতে পারে! ট্রান্স-জেন্ডার কমিউনিটির একজন অন্য একজন ট্রান্স-জেন্ডার কে সাপোর্ট করছেন, একজন যিনি পারিবারিক হিংসার শিকার তিনি এই সমস্যায় ভুগছেন তার পাশে দাঁড়ালেন, একজন জেলের আসামি তিনিই তার অন্য বন্ধুকে সাহায্য করলেন, একজন সুইসাইড আটেম্পট করেছেন তিনি অন্য আর একজনকে নিজের গল্প শোনালেন এইভাবে চলতে থাকবে প্রতিটি গ্রুপের পারস্পরিক সহমর্মিতা।
কমিউনিটিতে সমস্ত সোশ্যাল গ্র্যাজুয়েট, অঙ্গনওয়ারী কর্মীরা, আশা কর্মীরা এই গেট কিপার ট্রেইনিং প্রোগ্রাম, সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড ট্রেইনিং এ অংশীদার হতে হবে। সমাজের সমস্ত স্তরের মানুশকেই এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করা উচিত!
ন্যাশানাল লেভেল
কী কী পলিসি সুইসাইড প্রিভেনশানের জন্যে নেওয়া দরকার!
বার বার বলছি এটা কোনও একটি ডিপার্টমেন্টের বিষয় নয়! স্বাস্থ্য, আইন, অর্থনীতি, সামাজিক কল্যানকর বিভাগ, পুলিশ, মহিলা ও শিশু কল্যাণকর বিভাগ, এরকম আরও অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে একটি সংযোগ স্থাপন করে একে প্রতিরোধ করতে হবে! কোনও একজন বিভাগের পক্ষে সুইসাইডকে আটকানো সম্ভব নয়! এটা আমাদের সবার মিলিত দায়িত্ব!
National Mental Health Program (NMHP) সমস্ত জায়গায় সমস্ত রকমভাবে চালু হওয়া দরকার! প্রতিটি জেলায় একে বাধ্যতামূলক করা দরকার! Mental Health Care Act,2017 সামগ্রিক ভাবে সস্মত জায়গায় লাগু করা উচিত! বিভিন্ন টেকনলজিকাল মডেল, হেল্প লাইন সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়া!, অনালাইন কাউন্সেলিং টেলি সাইকিয়াট্রি পরিষেবা সমস্ত জায়গায় চালু করা দরকার!
মিডিয়ার ক্ষেত্রে খুব সংবেদনশীলভাবে এবং দায়িত্ব সহকারে রিপোর্ট করা উচিত! WHO এর গাইডলাইন মেনে রিপোর্টং করা দরকার। একটা বাজে দায়িত্বহীন মশালাদার গল্পের মতো রিপোর্টং সমাজে যেমন সঙ্ক্রামিত সুইসাইড বাড়িয়ে দিতে পারে(যাকে বলে Werther Effect) ঠিক তেমনি একটি মানবিক ও দায়িত্বপূর্ণ সচেতনমূলক রিপোর্টং অনেক সুইসাইড কমিয়ে আনতে পারে( যাকে বলে Papageno Effect)।