22/08/2026
তসলিমা নাসরিন লিখলেন -
আমি নির্দ্বিধায় ‘বন্দে মাতরম্’ বলি। এই উচ্চারণে আমি কোনও ধর্মীয় পরিচয় ঘোষণা করি না; আমি স্বীকার করি আমার ইতিহাস, আমার শিকড়, আমার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
আমি দেশভাগের পরে জন্মেছি, কিন্তু আমার বাবা-মা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মানুষ। ১৯৪৭ সালে একটি সীমান্তরেখা তাঁদের ভূগোলকে ভাগ করেছে। রাষ্ট্র ভাগ হয়েছে, কিন্তু ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্মৃতি—এসব তো কাঁটাতারের নির্দেশ মেনে ভাগ হয়ে যায় না।
আমার বাঙালি পরিচয়ও কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে জন্মায়নি। তার শিকড় ঐতিহাসিক ভারতবর্ষের দীর্ঘ সভ্যতায়। বাংলা ভাষার বিকাশ সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশের দীর্ঘ ভাষাগত ধারার সঙ্গে যুক্ত; বাংলার সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ঐতিহ্য আছে, শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারা আছে, রামায়ণ-মহাভারতের লোকায়ত রূপ আছে, সুফি প্রভাব আছে, ব্রাহ্ম আন্দোলন আছে, পাশ্চাত্য আধুনিকতার অভিঘাতও আছে। অর্থাৎ বাংলা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে আদানপ্রদানের মধ্য দিয়েই নিজের স্বতন্ত্র রূপ তৈরি করেছে।
কিন্তু সম্পর্কটি একমুখী নয়। বাংলা শুধু ভারতীয় সভ্যতার কাছ থেকে নেয়নি, ভারতীয় সভ্যতাকেও দিয়েছে অসামান্য চিন্তা, সাহিত্য, সংগীত, সংস্কার ও বিদ্রোহ। বাংলা ও ভারতবর্ষের সম্পর্ক অধীনতার নয়, বরং আত্মীয়তার, পারস্পরিক নির্মাণের।
এই কারণেই চর্যাপদ থেকে চণ্ডীদাস, বিদ্যাসাগর থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, রোকেয়া থেকে জসীমউদ্দিন—এই সমগ্র উত্তরাধিকার আমার। আজকের রাষ্ট্রসীমা টেনে কাউকে ‘ভারতের’ আর কাউকে ‘বাংলাদেশের’ বলে আমার সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে ভাগ করা যায় না। রাষ্ট্রের পাসপোর্ট আছে, সংস্কৃতির নেই।
ভারতীয় সভ্যতাও কোনও একটি ধর্ম, জাতি বা মতের সম্পত্তি নয়। বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু দর্শন, বহু বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দীর্ঘ সহাবস্থান এবং সংঘাতের মধ্য দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে। এর শক্তি একরূপতায় নয়, এর শক্তি বহুত্বে। সেই বহুত্বেরই আমি উত্তরাধিকারী।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালে। কিন্তু আমার বাঙালি সাংস্কৃতিক ইতিহাস ১৯৭১ সালে জন্ম নেয়নি। আমার ভাষা তার চেয়ে বহু পুরোনো, আমার সাহিত্য তার চেয়ে বহু পুরোনো, আমার পূর্বপুরুষের ইতিহাস তার চেয়ে বহু পুরোনো। সেই ইতিহাসের শিকড় ঐতিহাসিক ভারতবর্ষের মাটিতে বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত।
তাই আমি যখন অখণ্ড ভারতমাতাকে প্রণাম করি, কোনও রাজনৈতিক অখণ্ড ভারতের দাবি করি না। আমি প্রণাম করি দেশভাগের আগের সেই সাংস্কৃতিক ভারতবর্ষকে—যার ইতিহাসে আমার পূর্বপুরুষ ও পূর্বনারীরা আছেন, যার সভ্যতার ভেতর দিয়ে আমার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে, এবং যাকে গড়ে তুলতেও বাংলা বিরাট অবদান রেখেছে।
আমার জন্মরাষ্ট্রের বয়সের চেয়ে আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বয়স অনেক বেশি।
দেশভাগ মানচিত্র ভাগ করেছে, আমার ইতিহাস নয়।
সীমান্ত রাষ্ট্র নির্ধারণ করতে পারে; আমার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্ধারণ করতে পারে না।
এই বোধ থেকেই আমি নির্দ্বিধায় বলি—
বন্দে মাতরম্।