16/07/2026
শুভ রথযাত্রা! আজ জগন্নাথ দেব এর রথের রশিতে টান দেবার দিন, আনন্দের দিন । এই আনন্দের দিনে আসুন আপনাদের সাথে ভাগ করে নেই, আমার হাসপাতালের রোজকারের জীবন মৃত্যুর পাঞ্জা লড়াই এর খেলা থেকে আরও একটা জিতে যাওয়ার গল্প …
সুপর্ণা(নাম পরিবর্তিত), মধ্যবিত্ত বাড়ির এক ছা পোষা গৃহবধূ, স্বামী সংসার, এই নিয়ে তার দিন কাটে । উনুন এর ধোঁয়া আর গৃহস্থালির হাজার টা ঝামেলা সামলাতে সামলাতে ই জেরবার । সবার রোজকার ফাইফরমাশ, আর দিনগত পাপক্ষয় করে, যা একটু সময় নিজের জন্যে থাকে, তাতে সে কুরুশ বোনে, নিজের চাওয়া , পাওয়া, সুখ , দুঃখ, কুরুশ এর কাঁটা আর সুতোর ফাঁকে ফাঁকে আটকে যায়, আর সেই সব পাওয়া না পাওয়ার ঠাস বুনোটে, তৈরি হয় টেবিল ম্যাট, পাপোশ… আরও কত কি..
কিন্তু বাদ সাধে নিয়তি । দীর্ঘ সময় ধরে পায়খানার সাথে রক্ত পাত..”হতেই পারে অমন টা “ এই ভেবে ভেবে আর লুকিয়ে লুকিয়ে, একদিন আসে, মারাত্মক পেট ব্যথা, পেট ফুলে যাওয়া… কোলনস্কোপি করা হয়, মলাশয়ে বিশাল বড় টিউমার, বায়োপসি রিপোর্ট- adenocarcinoma
সুপর্ণা কে আমি প্রথম যখন দেখি, প্রায় বছর দেড়েক আগে… শরীর ভেঙ্গে গিয়েছে, খেতে পারেনা, কোমরে যন্ত্রণা। চিকিৎসা শুরু করি । প্রথমেই পায়খানার নতুন রাস্তা তৈরি করেন সার্জেন রা, যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় “diversion colostomy “, যেখানে পায়খানা বেরোনোর রাস্তা টা পেটের বাইরে একটা ব্যাগ এর মধ্যে করে দেওয়া হয় । তারপর শুরু হয় কেমোথেরাপি, তার সাথে রেডিওথেরাপি । দীর্ঘ চিকিৎসা, নানারকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, কিন্তু সংসারের যাঁতা কলে দিনরাত্রি পিষেও যার কুরুশ কাঁটা সুতো দিয়ে গল্প লেখে, ক্যান্সার এর সাধ্য কি তাকে আটকায়? সুপর্ণা চিকিৎসা নিতে থাকে, হাসিমুখে, আর যখনই ভয় পেয়েছে, আমরা সাহস যুগিয়েছি, দিনের শেষে লড়াই টা যে সুপর্ণার ই!
রেডিয়েশন শেষ, এবার অপারেশন এর পালা । সেটাও সুষ্ঠু ভাবে হয়ে যায় ।
এবার ই সেই অগ্নিপরীক্ষা, যাকে আমরা বলি ফলো আপ scan, যার মাধ্যমে আমরা দেখি, এত লড়াই এর নিট ফল টা কি… যাকে হারানোর জন্যে এত দিন ধরে এত কাণ্ড হলো, সেকি গিয়েছে?
স্ক্যান রিপোর্ট- একদম পরিষ্কার! শরীর থেকে মিলিয়ে গিয়েছে ক্যান্সার । এখনকার মতো যুদ্ধ শেষ! 😃
রাউন্ড দেওয়ার সময়, সুখবর টা দিলাম, দেখি সুপর্ণা এখানেও সেই কুরুশ কাঁটার গল্প লিখছে, আর বানিয়ে ফেলেছে কি সুন্দর একটা টেবিল ম্যাট! টুক করে ছবি তুলে নিলাম একটা, রোগমুক্তির খবর পেয়ে, মুখে একগাল হাসি, আবার ডাক্তারবাবু ছবি তুলেছে বলে তাতে একটু লজ্জা লজ্জা ভাব!
ছুটি র সময়, পায়ে পায়ে আমার কাছে এসে বলল, “স্যার, এটা আপনার জন্যে, নেবেন?”
এমন ভালোবাসার ধন, এ তো হীরে মানিক এর থেকেও দামি! নেবনা মানে?
বললাম,”নিশ্চয়ই নেব, তবে একটা ছবি তুলতে দিতে হবে!” আবার সেই লজ্জা, আবার সেই লুকিয়ে পড়া,কিন্তু আমি ছাড়লাম না । 😃
আপনার আমার আশেপাশে, এমন কতশত সুপর্ণা লুকিয়ে থাকে, নিজের শরীর এর রোগ জ্বালা, কষ্ট, উনুনের আঁচে দিতে দিতে, নিজেই একদিন ছাই হয়ে যায়, কেউ জানতেও পারেনা । আমরা ডাক্তার রা চাই, তাদের ভালো রাখতে । কারণ, তারা আমাদের ভালো রাখে । সংসার কে ভালো রাখে ।
প্রভু জগন্নাথ আর বলভদ্র এর মাঝে কে থাকেন দেখেছেন? দেবী সুভদ্রা, তিনি আকারে ছোট, কিন্তু তিনি দুই দিকে দুই ভাইকে আগলে রেখেছেন, আবার তিনি ই মহামায়া, দশ হাতে ধারণ করছেন বিশ্বসংসার কে । তিনি ই আমাদের মধ্যে রয়েছেন, মা, বোন, স্ত্রী, আরও কত রূপে । তাদের ভালো রাখুন, তাদের খেয়াল রাখুন ।
জয় শ্রী জগন্নাথ, জয় বলভদ্র, জয় দেবী সুভদ্রা!
পুনশ্চ: সুপর্ণার টেবিল ম্যাট টা ই আজ শ্রী জগন্নাথ এর আসন করলাম, কারণ আমার মতে, প্রভু ভক্তের ভালোবাসা তেই আসন পাতেন। অন্য কোনও আড়ম্বর সেখানে তুচ্ছ!