18/05/2026
আমি একজন ডেলিভারি বয়।
বেশিরভাগ সময়ই আমার ডিউটি থাকে সন্ধ্যার শিফটে।
সেদিন রাত প্রায় ৯টার সময় আমি শেষ অর্ডারটা হাতে পাই।
রেস্টুরেন্ট থেকে প্যাকেটটা নেওয়ার সময় খেয়াল করলাম—অর্ডারটা খুবই ছোট।
সাধারণ খিচুড়ি, একটু দই, আর দুটো কলা।
ঠিকানাটা ছিল শহরের পুরনো অংশে।
একটা জরাজীর্ণ পুরনো বাড়ি।
তৃতীয় তলা পর্যন্ত সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হলো।
আমি দরজার বেল টিপলাম।
একজন বৃদ্ধা দরজা খুললেন।
সাদা চুল, কাঁপা কাঁপা হাত, চোখে মোটা চশমা।
মুখে ক্লান্তির ছাপ ছিল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক মমতা।
তিনি মৃদু হেসে বললেন—
“বাবা, খাবারটা ভেতরে টেবিলের ওপর রেখে দাও তো…
হাত দুটো খুব কাঁপে।”
আমি খাবারটা টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলাম,
ঠিক তখনই তিনি আবার বললেন—
“দু’মিনিট বসবে বাবা?
একা একা খেতে আর ভালো লাগে না…”
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম।
আমার শিফট শেষ হয়ে গিয়েছিল।
শরীরও বেশ ক্লান্ত ছিল।
তবু কেন জানি না, আমি বসে পড়লাম।
ঘরটা একদম নিস্তব্ধ ছিল।
দেওয়ালে ঝোলানো পুরনো ঘড়ির টিকটিক শব্দ ভেসে আসছিল।
এক কোণে ছোট্ট করে ঈশ্বরের ছবি।
আর সামনের দেয়ালজুড়ে অসংখ্য পুরনো ফ্রেমবন্দী ছবি।
বৃদ্ধা ধীরে ধীরে খাবারের প্লেট খুললেন।
খুব আস্তে আস্তে খিচুড়ি খেতে শুরু করলেন।
প্রতি দু’কামড় পরপর আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসছিলেন।
হঠাৎ তিনি বললেন—
“জানো বাবা, আমি রোজ বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করি না।
আজ শুধু মনে হলো…
একটা মানুষের গলার শব্দ শুনতে ইচ্ছে করছে।”
আমি চুপ করে রইলাম।
তিনি দেয়ালের একটা ছবির দিকে আঙুল তুলে বললেন—
“এই যে, উনি আমার স্বামী।
রেলে চাকরি করতেন।
পাঁচ বছর আগে চলে গেছেন।”
তারপর আরেকটা ছবির দিকে তাকালেন।
“এটা আমার ছেলে।
কানাডায় থাকে।
খুব ভালো আছে…
প্রতি মাসে টাকা পাঠায়।”
এরপর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
মুখে হাসি ছিল, কিন্তু চোখ ভিজে উঠেছিল।
তিনি ধীরে বললেন—
“শুধু…
কথা পাঠানোর সময়টা আর হয় না।”
হঠাৎ যেন ঘরের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা আরও জোরে শোনা যেতে লাগল।
তিনি আবার একটু খিচুড়ি খেলেন।
“এটা আমার মেয়ে।
বেঙ্গালুরুতে থাকে।
নিজের সংসারে খুব সুখে আছে।
থাকুক…
সন্তানরা যদি উড়তেই না শেখে, তাহলে এত কষ্ট করে মানুষ করলাম কেন?”
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর গলা কেঁপে উঠছিল।
তবু মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না।
ছিল শুধু এক গভীর শূন্যতা।
হঠাৎ তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—
“তোমার মা আছেন বাবা?”
আমি বললাম—
“হ্যাঁ, আছেন।”
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন—
“প্রতিদিন ফোন করো?”
আমি চুপ করে গেলাম।
সত্যি বলতে, আমিও অনেকদিন বাড়িতে ফোন করতাম না।
কাজের চাপ, ক্লান্তি, ব্যস্ততা—
প্রতিবার ভাবতাম, ‘কাল ফোন করব।’
বৃদ্ধা আমার নীরবতা বুঝে ফেলেছিলেন।
খুব শান্ত গলায় বললেন—
“মা-বাবারা টাকা গোনেন না বাবা…
ওরা অপেক্ষা করে সন্তানের কণ্ঠস্বরের জন্য।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন ভেঙে গেল।
খাওয়া শেষ হলো।
তিনি একটু জল খেলেন।
তারপর পার্স থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
বললেন—
“এটা টিপস নয় বাবা।
এই আধঘণ্টা তুমি আমাকে একা খেতে দাওনি—
এটা তার দাম।”
আমি তাড়াতাড়ি বললাম—
“না না, মা, এটা আমি নিতে পারব না।”
তিনি মৃদু হেসে বললেন—
“নাও বাবা।
আজ তুমি শুধু খাবার পৌঁছে দাওনি…
তুমি সঙ্গ পৌঁছে দিয়েছ।”
শেষ পর্যন্ত আমি টাকাটা নিলাম।
কিন্তু পকেটে রাখতে পারলাম না।
হাতেই ধরে রইলাম।
আমি বেরিয়ে আসছিলাম, তখন তিনি আবার ডাকলেন—
“আর শোনো—
আজ বাড়ি গিয়ে মাকে অবশ্যই ফোন করবে।”
সেদিন রাতে বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে আমি বাইক স্টার্ট দিইনি।
প্রথমেই মাকে ফোন করেছিলাম।
ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো—
“হঠাৎ আজ ফোন করলি?
সব ঠিক আছে তো বাবা?”
শুধু সেই গলাটা শুনেই আমার গলা ধরে এলো।
আমি ধীরে বললাম—
“হ্যাঁ মা…
শুধু তোমার গলাটা শুনতে ইচ্ছে করছিল।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মা বললেন—
“খেয়েছিস তো?”
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েই আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম।
সেই রাতের পর থেকে আমি প্রতিদিন মাকে ফোন করতে শুরু করি।
আর শুধু মাকেই নয়—
প্রতিটা ডেলিভারিও আমার কাছে আর শুধুমাত্র একটা অর্ডার রইল না।
কোনো বাড়িতে ওষুধের দরকার হয়।
কোনো বাড়িতে একাকীত্বের একটু উপশম দরকার হয়।
কোনো বাড়িতে কারও ফেরার অপেক্ষা শেষ হওয়ার প্রয়োজন হয়।
আবার কোনো বাড়িতে শুধু দরকার হয়—
একটা মানুষের কণ্ঠস্বর।
এখন দরজা খুললেই আমি আর তাড়াহুড়ো করি না।
আমি মুখের দিকে তাকাই।
কথার ভেতরের ক্লান্তি শুনতে চেষ্টা করি।
মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করি—
“সব ঠিক আছে তো?”
বেশিরভাগ মানুষ শুধু বলে—“হ্যাঁ।”
কেউ একটু হাসে।
আবার কিছু মুখ বলে দেয়—
সারাদিন তারা কারও সঙ্গে কথা বলেনি।
দু’মাস পরে আবার সেই একই ঠিকানা থেকে একটা অর্ডার এলো।
আমি তাড়াতাড়ি সেখানে গেলাম।
কিন্তু দরজা খুললেন অন্য একজন।
পাশের ফ্ল্যাটের এক আন্টি।
তিনি ধীরে বললেন—
“মা গত সপ্তাহে মারা গেছেন।”
আমি কয়েক মুহূর্ত দরজার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
হাত খালি ছিল,
তবু মনে হচ্ছিল ভেতরে যেন খুব ভারী কিছু ভেঙে পড়েছে।
আন্টি ভেতর থেকে একটা ছোট খাম এনে আমার হাতে দিলেন।
বললেন—
“এটা তোমার জন্য রেখে গিয়েছেন।”
কাঁপা হাতে খামটা খুললাম।
ভেতরে ছিল সেই ৫০০ টাকার নোট।
আর একটা ছোট্ট চিরকুট।
তাতে লেখা ছিল—
“বাবা,
যদি তুমি এই চিঠিটা পড়ো, তবে আমি আর নেই।
সেদিন আমার সঙ্গে বসে খাওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
তুমি আমাকে শুধু খাবার দাওনি—
সম্মান দিয়েছিলে।
আর হ্যাঁ…
মাকে নিয়মিত ফোন করবে।
— মা”
আজও সেই ৫০০ টাকা আমার ব্যাগের ভেতরের পকেটে রাখা আছে।
আমি কখনও খরচ করিনি।
কারণ সেদিন আমি প্রথমবার বুঝেছিলাম—
প্রতিটা দরজার ওপাশে শুধু একজন কাস্টমার থাকে না।
কখনও সেখানে একজন মা অপেক্ষা করেন।
কখনও অপেক্ষা করে থাকে নিঃসঙ্গতা।
কখনও সেটা হয় জীবনের শেষ কথোপকথন।
আমরা সবাই কোনো না কোনো ক্ষুধা নিয়ে বেঁচে আছি।
কারও দরকার খাবার,
কারও দরকার ওষুধ,
আর কারও দরকার শুধু দু’মিনিটের সঙ্গ।
মানুষ সবসময় টাকার ডেলিভারি চায় না—
কখনও কখনও তারা শুধু চায়
একটু উপস্থিতি,
একটু মানবিকতা,
একটু সময়।
গল্পটা এখানেই শেষ।
কিন্তু সত্যি বলতে—
গল্প শেষ হয়ে গেলেও বুকের ভেতরের ভার অনেকদিন থেকে গিয়েছিল।
একাকীত্ব আর বার্ধক্য—
এই দুটো একসাথে যখন জীবনে আসে, তখন তা সত্যিই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
আর যদি তার সঙ্গে অভাব-অনটনও যোগ হয়,
তবে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডি।
Collected.