03/09/2026
সাম্প্রতিক কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা প্রসঙ্গে
বিগত কয়েকদিনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলিতে একের পর এক উদ্বেগজনক ঘটনা আমাদের চোখে পড়েছে।
১৯–২০ আগস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের বিধ্বংসী হামলা, নন্দলাল বসুর ঐতিহ্যবাহী এমব্লেম-সহ ক্যাম্পাসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ; ৩০ আগস্ট যাদবপুরে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি, চিত্তপ্রসাদের ছবি সহ ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন গ্রাফিতির উপর চুনকাম করে সেগুলি মুছে দেওয়া; ১ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয়ের দেওয়ালে জোরপূর্বক রং চাপিয়ে দেওয়া; এবং ২ সেপ্টেম্বর উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তার ও ছাত্রছাত্রীদের অ্যাডমিশন হেল্পডেস্ক ও নেতাজির ছবি-উদ্ধৃতিসম্বলিত উপহার কর্মসূচিতে বহিরাগত দুষ্কৃতীদের নৃশংস হামলা— এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। এই প্রতিটি ঘটনাতেই সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে অভিযোগের তীর উঠেছে শাসকদল, তাদের ঘনিষ্ঠ ছাত্রসংগঠনগুলি এবং বিভিন্ন গণসংগঠনের দিকে।
ভারতের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকার, ছাত্রছাত্রীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ক্যাম্পাসের সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আক্রমণের যে প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে।
মুক্তচিন্তা ও বিরুদ্ধমতকে স্তব্ধ করার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার যখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখনই তৈরি হয় ‘থ্রেট কালচার’-এর ভিত্তি। বিরোধী স্বরহীন, ভয় ও আনুগত্যনির্ভর একটি অগণতান্ত্রিক পরিসরই শেষ পর্যন্ত এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে জন্ম নেয় সেই সমস্ত অপরাধী, যারা অভয়ার খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটানোর দুঃসাহস রাখে।
ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে—গায়ের জোর এবং ক্ষমতার ঔদ্ধত্য কোনওদিনই চিরস্থায়ী হয় না। মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত নিজের পথ তৈরি করে নেয়।
আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, ঐতিহাসিক অভয়া আন্দোলনের সময়ও ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভাঙচুর চালিয়ে, ছাত্রছাত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী ও জুনিয়র ডাক্তারদের উপর হামলা করে এবং তাঁদের খুন-ধর্ষণের হুমকি দিয়ে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দুর্বৃত্তরা হাসপাতালের অভ্যন্তরে চলমান আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই রক্তহিম করা বর্বর আক্রমণের প্রতিস্পর্ধাতেই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল মানুষের ন্যায়বিচারকামী দুর্বার চেতনা।
আজও সেই ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—ভয় দেখিয়ে, হামলা চালিয়ে, দেওয়াল মুছে দিয়ে, কণ্ঠরোধ করে কোনও আন্দোলন বা গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন স্তব্ধ করে রাখা যায় না।
একইসঙ্গে, সাম্প্রতিক প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। কোথাও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায়, কোথাও আবার এই উর্দিধারী বাহিনীই ভীষণ অগণতান্ত্রিক ও আক্রমণাত্মক।
যাদের দায়িত্ব সমাজে এবং ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যায় ও অপরাধকে প্রতিহত করা; তাদের নিষ্ক্রিয়তা বা পক্ষপাত যেন আর কোনওভাবেই এই ধরনের ঘটনার সুযোগ তৈরি না করে। রাজনৈতিক রং, প্রশাসনিক চাপ কিংবা কোনও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর প্রভাবের কাছে মাথা নত না করে পুলিশ ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা এবং ছাত্রসমাজের প্রতিবাদী মননকে দমন করার যে কোনও প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। ভয় দেখিয়ে ছাত্রসমাজের কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায় না। প্রতিবাদী দেওয়াল লিখন মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত চিন্তাকে মুছে ফেলা যায় না।
বিদ্রোহী কবি নজরুলের আহ্বান আমরা আজও প্রতিধ্বনিত করি
"মোদের চক্ষে জ্বলে
জ্ঞানের মশাল,
বক্ষে ভরা বাক্,
কন্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন
নিত্য কালের ডাক।
আমরা তাজা খুনে
লাল ক’রেছি
সরস্বতীর শ্বেত কমল।
আমরা ছাত্রদল।।”