31/07/2026
যারা ভাবছেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার কি আদৌ প্রয়োজন আছে ?
এই লেখাটি তাদের জন্য ।
- ডাঃ অরুণাভ বিশ্বাস
আমরা পোলিওকে ভুলে গেছি।
আর সেটাই ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় “অপরাধ”!
একটা সময় ছিল—একটি সুস্থ-স্বাভাবিক শিশু হঠাৎ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতে পারত।
কেউ আর হাঁটতে পারত না।
কারও হাত-পা অবশ হয়ে যেত।
কেউ কেউ নিজের ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলত।
আর তখনকার পৃথিবীতে “Iron Lung” ছিল প্রযুক্তির আশীর্বাদ—এক বিশাল ধাতব যন্ত্রের ভেতর শুয়ে থেকে যেটা কারও হয়ে শ্বাস নিত।
সম্প্রতি মারা গেলেন Martha Ann Lillard—আমেরিকার শেষ জীবিত মানুষ, যিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্য Iron Lung-এর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
১৯৫৩ সালে পোলিও আক্রান্ত হওয়ার পর, সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেই বিশাল যন্ত্রটি।
ভাবুন তো—
আজ আমরা পোলিও নিয়ে কতটা ভয় পাই?
প্রায় একেবারেই না।
আর এখানেই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় irony।
ভ্যাকসিন এত ভালো কাজ করেছে যে, আমরা রোগটাকেই ভুলে গেছি।
আমরা সেই পৃথিবী দেখিনি যেখানে পোলিওর মৌসুম মানেই ছিল আতঙ্ক।
দেখিনি হাজার হাজার শিশুকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে।
দেখিনি বাবা-মায়ের অসহায় মুখ।
দেখিনি সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে Iron Lung-এর ভেতর শুইয়ে রাখার নির্মম বাস্তবতা।
তাই আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় বসে কেউ কেউ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্ন করেন—
“পোলিও তো দেখিই না। তাহলে ভ্যাকসিনের দরকারটা কী?”
অসাধারণ যুক্তি!
আগুন নেভানোর পর বাড়িতে আগুন দেখা যাচ্ছে না—
তাই ফায়ার ব্রিগেডটাই বোধহয় অপ্রয়োজনীয়!
সিটবেল্ট পরে দুর্ঘটনায় বেঁচে গেলেন—
তাই সিটবেল্টের কোনো কাজ নেই!
পোলিও নেই বলেই পোলিও ভ্যাকসিন অপ্রয়োজনীয়—
এই যুক্তিটা অনেকটা মশা না থাকায় মশারি ছিঁড়ে ফেলার মতো।
এটাই ভ্যাকসিনের সাফল্যের অদ্ভুত পরিহাস—
বিজ্ঞান যখন সফল হয়, তার সাফল্যটাই অনেক সময় তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
রোগ কমে যায় → রোগের ভয় কমে যায় → রোগের ইতিহাস ভুলে যায় → তারপর প্রশ্ন ওঠে,
“ভ্যাকসিনটা আদৌ দরকার আছে?”
আর সেই শূন্যস্থানেই ঢুকে পড়ে Facebook University-এর অধ্যাপকরা—
অর্ধসত্য, ভুল তথ্য, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর “আমার এক আত্মীয়ের পরিচিত একজন বলেছে…” মার্কা গবেষণা নিয়ে! 🙃
কিন্তু ভ্যাকসিন শুধু একটা ইনজেকশন নয়।
এর পেছনে আছে অসংখ্য শিশুর পক্ষাঘাত, অসহায় পরিবার, মৃত্যু, আজীবনের প্রতিবন্ধকতা—আর সেই বিপর্যয় থেকে শেখা কয়েক দশকের বিজ্ঞান।
Martha Ann Lillard-এর মৃত্যু তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়।
তাঁর Iron Lung যেন আমাদের শেষবারের মতো মনে করিয়ে দিয়ে গেল—
রোগকে ভুলে যাওয়া যায়।
কিন্তু রোগটা কেন আর দেখা যাচ্ছে না—সেটা ভুলে যাওয়া যায় না।
কারণ ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—
যে বিপর্যয় থেকে সে আমাদের বাঁচিয়েছে, সেটাকেই একদিন আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে শুরু করে।
আর সবচেয়ে বড় irony-টা এখানেই!
ধরুন, পৃথিবীর প্রতিটি শিশু যদি সময়মতো পোলিও টিকা পায় এবং ভাইরাসের সংক্রমণের শৃঙ্খল সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া যায়—একদিন পোলিও পৃথিবী থেকে eradicated হয়ে যেতে পারে।
তারপর?
পোলিও টিকার আর প্রয়োজনই থাকবে না।
ঠিক যেমন smallpox-এর ক্ষেত্রে হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক টিকাদান ও নির্মূল কর্মসূচির ফলে ১৯৮০ সালে smallpox-কে পৃথিবী থেকে eradicated ঘোষণা করা হয়। আজ তাই smallpox-এর vaccine দেওয়া হয় না।
এবার একটু মাথা খাটিয়ে ভাবুন—
যে ভ্যাকসিন সফল হয়ে রোগটাকেই পৃথিবী থেকে মুছে দেয়, সেই ভ্যাকসিনের “ব্যবসা” তো একদিন নিজেই শেষ হয়ে যাবে!
অর্থাৎ, ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত সাফল্য হলো—
নিজের প্রয়োজনটাই একদিন শেষ করে দেওয়া।
কী অদ্ভুত “ব্যবসায়িক মডেল”!
আর অন্যদিকে Facebook-এ বসে কিছু তথাকথিত ইয়ে-পাকা “বিশেষজ্ঞ” ঘোষণা করেন—
“ভ্যাকসিন কোম্পানি শুধু টাকা কামানোর জন্য ভ্যাকসিন বানায়!”
বাহ!
যে ব্যবসা সফল হলে তার নিজের পণ্যেরই প্রয়োজন একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, সেটাকেই আমরা নিখাদ ষড়যন্ত্রের প্রমাণ বানিয়ে ফেলি!
আর তখনই প্রশ্নটা একটু উল্টো করে করা দরকার—
প্রমাণ কোথায়? গবেষণা কোথায়? তথ্য কোথায়?
নাকি YouTube/Facebook-এর একটা ভিডিও, “আমার এক পরিচিত ডাক্তার বলেছে” এবং WhatsApp University-এর PhD-ই যথেষ্ট?
- Dr Arunava Biswas, MBBS, PhD
আর “ভ্যাকসিন কোম্পানির স্বার্থ” নিয়ে এত চিন্তা যদি সত্যিই থাকে, তাহলে একই যুক্তিতে প্রশ্ন করুন—
রোগটা পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেলে লাভ কার?
রোগী নেই → চিকিৎসা নেই।
রোগ নেই → ওষুধ নেই।
সংক্রমণ নেই → ভ্যাকসিনেরও একদিন প্রয়োজন নেই।
তাই conspiracy theory ছড়ানোর আগে অন্তত এটুকু বোঝা দরকার—
ভ্যাকসিনের সাফল্যকে ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে প্রমাণ বানানো ইতিহাসের সবচেয়ে হাস্যকর যুক্তিগুলোর একটি।
ভারত পোলিও ইরাডিকেশন এর দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েও এখনও কিছু মানুষের টিকাকরণে অংশগ্রহণ না করার কারণে সফল হতে পারেনি। লক্ষ কোটি টাকার public money দিয়ে পোলিও টিকাকরণ কর্মসূচী বার বার চালিয়ে যেতে হচ্ছে । এই anti-vaccine campaign কারীরা এর জন্য দায় এড়াতে পারে না।
একটু গভীরে গিয়ে ভাবলেই বোঝা যাচ্ছে, “ভ্যাকসিন কোম্পানির মুনাফার স্বার্থ” যদি কেউ দেখছে - সেটা এই ভ্যাকসিন বিরোধী প্রচারকারীরা। এদের কোথায় প্রভাবিত হয়ে যদি কিছু জন ভ্যাকসিন না নেয় - তাহলে রোগ eradicated (নিশ্চিহ্ন) হবে না, বার বার টিকাকরণের প্রয়োজনীয়তা থাকবে। তাই টিকা-বিরোধী প্রচারে funding কীভাবে হতে পারে..... বাকিটা বুঝে নিন।
পোলিওকে আমরা আজ খুব একটা দেখি না।
কারণ পোলিও ভালো হয়ে যায়নি।
কারণ আমরা তাকে থামিয়েছি।
আর সেই সাফল্যকে যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে ইতিহাস আবার আমাদের শেখাতে বসবে—
এইবার আরও নির্মম পরীক্ষার মাধ্যমে।
- Dr Arunava Biswas, MBBS, PhD