16/05/2026
আজ চেম্বারে ঢুকেই সুদীপবাবু বেশ কাঁচুমাচু মুখে বসলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কষ্ট হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করার আগেই উনি একরাশ অভিযোগ নিয়ে শুরু করলেন—
🧓🏻"ডাক্তারবাবু, মাথায় চিরুনি ছোঁয়াতে পারছি না, হাত তো উঠছেই না! জামার হাতা গলাতে গিয়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখছি।আর আজ কিন্তু আপনার জন্য এক গুচ্ছ প্রশ্ন আছে । তবে প্রথমেই বলে রাখি— অপারেশন কিন্তু আমি করাবো না!"
👨🏻⚕️আমি একটু হেসে বললাম, "আসেন সুদীপবাবু, শান্ত হয়ে বসুন। আপনার এই যে হাত তুলতে না পারা বা হাত জ্যাম হয়ে যাওয়া— একেই আমরা বলি ফ্রোজেন শোল্ডার (Frozen Shoulder)। আপনার কাঁধটা একদম জমে বরফের মতো হয়ে গেছে।"
🧓🏻সুদীপবাবু অবাক হয়ে বললেন, "আমি তো ক্রিকেট খেলতে গিয়ে চোট পাইনি, এমনকি সিঁড়ি দিয়ে পড়েও যাইনি। তাহলে হুট করে জ্যাম কেন হলো?"
✍🏻আমি ওনার পুরোনো রিপোর্টগুলো দেখছিলাম। ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, "এই যে রিপোর্টে সুগারটা বেশি দেখছি, এটা কবে থেকে?"
🧓🏻উনি আকাশ থেকে পড়লেন, "কেন? সুগারের জন্য কি কাঁধ জ্যাম হয় নাকি?"
🔎আমি ওনাকে সহজ করে বুঝিয়ে বললাম, "দেখুন, আমাদের কাঁধের জয়েন্টের চারদিকে একটা পাতলা আবরণের মতো অংশ থাকে, যাকে আমরা বলি ক্যাপসুল। যাদের সুগার বেশি থাকে, তাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এই ক্যাপসুলটা আস্তে আস্তে মোটা আর শক্ত হয়ে যায়। ফলে হাত নাড়াতে গেলেই টান লাগে আর প্রচণ্ড ব্যথা হয়।"
✍🏻শুধু সুগার নয়, থাইরয়েডের সমস্যা বা অনেকদিন হাত একভাবে ফেলে রাখলেও এটা হতে পারে। এবং বাত এর জন্যও হতে পারে I
🩻একদম সহজভাবে বলতে গেলে, আমাদের কাঁধ হলো একটা 'বল আর সকেট' জয়েন্ট। একটা বাটির মতো গর্তে একটা বল বসানো থাকে। আর এই পুরো সেটআপটাকে ধরে রাখে লিগামেন্ট, টেন্ডন আর ওই ক্যাপসুলটা। যখনই কোনো কারণে ওই ক্যাপসুলে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হয়, তখনই শুরু হয় আসল যন্ত্রণা।
✅আমি সুদীপবাবুকে বললাম, এই রোগটা সাধারণত তিনটে স্টেজে চলে:
1. ফ্রিজিং স্টেজ (Freezing): প্রথম দিকে শুধু ব্যথা। হাত নাড়াতে গেলেই মনে হয় কেউ চ্যাঁত করে কামড় দিচ্ছে। বিশেষ করে রাতে ঘুমোতে গেলেই বিপদ বাড়ে।
2. ফ্রোজেন স্টেজ (Frozen): এই পর্যায়ে ব্যথা হয়তো একটু থিতু হয়, কিন্তু হাত একদম আড়ষ্ট হয়ে যায়। হাত ওপর দিকে তোলা বা পিঠের দিকে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
3. থয়িং স্টেজ (Thawing): এটা হলো বরফ গলার সময়। ঠিকঠাক চিকিৎসা আর ব্যায়ামে কাঁধ আবার সচল হতে শুরু করে।
🧓🏻সুদীপবাবু চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে উপায় কি ডাক্তারবাবু? ওষুধেই কি সব ঠিক হবে?"
👨🏻⚕️আমি ওনাকে আশ্বস্ত করে বললাম:
💊শুরুতে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ আর সঠিক ফিজিওথেরাপি বা নির্দিষ্ট কিছু এক্সারসাইজ ( যেমন পেন্ডুলাম এক্সারসাইজ বা ফিঙ্গার ল্যাডার )করলেই কাজ হয়।
মনে রাখবেন ব্যথানাশক ওষুধের চেয়েও কিন্তু জরুরি হলো সুগার নিয়ন্ত্রণ। সুগার না কমলে কাঁধের বরফ গলানো কঠিন।
🖌️সাধারণ ব্যায়ামে কাজ না হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে UST TENS LASER জাতীয় থেরাপি দেওয়া যেতে পারে ।
💉 যদি ব্যথা খুব বেশি হয়, তবে আমরা আল্ট্রাসাউন্ড (USG) মেশিনে দেখে ঠিক জায়গামত ইনজেকশন দিই। এতে কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই জ্যাম অনেকটা কেটে যায়।
🔎সবশেষে বললাম, "আর অপারেশনের কথা যেটা বললেন, সেটা একদম শেষ ধাপ। আজকাল উন্নত চিকিৎসার যুগে অপারেশন খুব কম মানুষেরই লাগে।"
🧓🏻সুদীপবাবু এবার একটু আশ্বস্ত হলেন। হাসিমুখে বললেন, "না না, তাহলে সুগারটা আজ থেকেই কমিয়ে ফেলছি! আপনার দেওয়া ওষুধ শুরু করছি র দেখিয়ে দেওয়া ব্যাম I আচ্ছা ডাক্তারবাবু, সব তো বুঝলাম... কিন্তু এই আমের দিনে কি আম একদমই খাবো না?"
👨🏻⚕️আমি হেসে বললাম, "এই তো! পরের দিনের গল্পের টপিক পেয়ে গেলাম! আম খাওয়া যাবে কি যাবে না, সেটা নিয়ে না হয় পরের দিন আড্ডা হবে।"
🥭সুদীপবাবুও হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন, "ঠিক আছে ডাক্তারবাবু, আপনার ফেসবুক পেজটা তাহলে ফলো করতে থাকছি, ওখানেই আমের উত্তরটা পাবো আশা করি!"
আপনারও কি হাত তুলতে সমস্যা হচ্ছে? সুগার থাকলে কিন্তু সাবধান! নিয়ম মেনে এক্সারসাইজ করবেন , এটা হওয়ার আগেই আটকে দিন I ফ্রোজেন শোল্ডার অবহেলা করবেন না। fans