22/09/2026
"চেয়ারে বসতেই মৌসুমীদেবী কাতর স্বরে বলে উঠলেন, 'ডাক্তারবাবু, ডান হাতটা যেন আর আমার নেই। বুড়ো আঙুলের গোড়ায় এমন টান ধরে, মনে হয় কেউ সুচ ফুটিয়ে দিচ্ছে। বাচ্চার গলার ফাঁকে জামার বোতাম পরাতে পারছি না, জলের বোতলের ছিপি খুলতে পারছি না। আর ওকে কোলে তোলা? সে তো দুঃস্বপ্ন! পাড়ার লোক বলল বাতের ব্যথা, তেল মালিশ করলাম, গরম সেঁক দিলাম—ব্যথা কমার বদলে দ্বিগুণ হয়ে গেল।'"
👨🏻⚕️"একটু দেখি তো হাতটা," বলে আমি ওনার হাতটা আলতো করে ধরলাম। "বুড়ো আঙুলটা তালুর ভেতর ঢুকিয়ে বাকি চার আঙুল দিয়ে শক্ত করে মুঠো করুন তো? এবার কব্জিটা কড়ে আঙুলের দিকে একটু নিচু করার চেষ্টা করুন।"
👱🏼♀️চেষ্টা করতেই মৌসুমীদেবী চমকে হাত টেনে নিলেন—"উফ ডাক্তারবাবু! মরে গেলাম! ঠিক এই জায়গাটায় যেন চামড়া ছিঁড়ে রগটা ফেটে যাবে!"
👨🏻⚕️আমি শান্তভাবে ওনার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললাম, "ব্যথাটা যেখানে হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে আমরা বলি De Quervain’s Tenosynovitis (ডি কারভেইনস টেনোসাইনোভাইটিস), সংক্ষেপে DQ।"
👱🏼♀️মৌসুমীদেবী বললেন , "কী অদ্ভুত নাম! কিন্তু ভেতরে ঠিক কী হচ্ছে ডাক্তারবাবু? হাড় কি সরে গেছে?"
👨🏻⚕️"না, হাড়ের কিচ্ছু হয়নি," টেবিলের ওপর রাখা হাতের একটা প্লাস্টিক মডেল টেনে নিয়ে বুঝিয়ে বললাম, "খুব সহজ করে ভাবুন। আমাদের বুড়ো আঙুলটাকে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে বা করতে গেলে আর ওপরের দিকে তোলার জন্য দুটো প্রধান রগ বা টেনডন কাজ করে—Abductor Pollicis Longus আর Extensor Pollicis Brevis। কব্জির ওপর দিয়ে এই দুটো রগ যখন যায়, তখন ওরা একটা সরু ফাইবারাস সুড়ঙ্গ বা পুলির ভেতর দিয়ে চলাচল করে। স্বাভাবিক অবস্থায় সুড়ঙ্গের ভেতরের আবরণ পিচ্ছিল থাকে, তাই রগগুলো মাখনের মতো মসৃণভাবে ওঠানামা করতে পারে।"
👱🏼♀️"তাহলে আমার ক্ষেত্রে কী হলো?"
👨🏻⚕️"যখন বারবার বুড়ো আঙুল ছড়িয়ে কোনো ভারী জিনিস তোলা হয়—যেমন বাচ্চার বগলের নিচে হাত দিয়ে 'L' শেপে বুড়ো আঙুলটা ফাঁক করে কোলে নেওয়া, বারবার একহাতে ফোন স্ক্রোল করা বা জামাকাপড় নিংড়ানো—তখন ওই সরু সুড়ঙ্গটায় রগগুলোর অনবরত ঘষা লাগে। ঘর্ষণের চোটে রগের ওপরের পাতলা আবরণে তীব্র ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ তৈরি হয়। সহজ কথায়, সুড়ঙ্গটাও ফুলে ভেতরটা সরু হয়ে যায়, আর রগ দুটোও ফুলে মোটা হয়ে যায়। এখন একটা সরু পাইপের ভেতর মোটা তার টানলে যা হয়—রগ আটকে গিয়ে তীব্র ঘষা খায় আর বিদ্যুৎ চমকানোর মতো যন্ত্রণা হয়।"
👱🏼♀️মৌসুমীদেবী খানিকটা থমকে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, "কিন্তু ডাক্তারবাবু, আমার এই বয়সেই এটা কেন হলো? পাড়ার সবাই তো বাচ্চাকে কোলে নেয়, আমার একারই এমন কপাল কেন?"
👨🏻⚕️আমি মৃদু হেসে বললাম, "আপনি একা নন মৌসুমীদেবী। ভারতের মতো দেশে এটা কিন্তু অত্যন্ত পরিচিত এক সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্ট্যাটিস্টিকস দেখলে বোঝা যায়, সারা বিশ্বেই প্রতি এক হাজার জনে প্রায় ৩ জন এই সমস্যায় পড়েন, কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার থেকে আট গুণ বেশি! বিশেষ করে ৩৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব সবথেকে বেশি। আর আমাদের ভারতীয় সমাজে যেখানে গৃহস্থালির কাজ—মসলা বাটা, ভারী কড়াই বা বালতি তোলা, কাপড় নিংড়ানো—সবটাই মহিলারা একহাতে সামলান, সেখানে এই ঘটনা ঘরে ঘরে ঘটে। নতুন মায়েদের হরমোনের ওঠানামা আর স্তন্যদানের সময় ফ্লুইড রিটেনশনের কারণেও এই রগগুলো দ্রুত ফুলে ওঠে। তাই বিদেশে একে অনেক সময় 'মাদার্স রিস্ট' (Mother’s Wrist) বা 'বেবি রিস্ট' (Baby Wrist) ও বলা হয়।"
👱🏼♀️মৌসুমীদেবী খানিক ভেবে বললেন, "শুধু কি বাচ্চাকে তোলার জন্যই এটা হয়?"
👨🏻⚕️"সব সময় শুধু কাজের চাপই একমাত্র কারণ নয়," আমি যোগ করলাম, "জানেন তো, রক্তে সুগার বা ইউরিক অ্যাসিড বেশি থাকলে, কিংবা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেও কিন্তু এই রগের সুড়ঙ্গে প্রদাহ বাঁধতে পারে!"
👱🏼♀️"সুগার থাকলে রগে ব্যথা?" উনি অবাক।
👨🏻⚕️"হ্যাঁ! সুগার বেশি থাকলে রক্তে জমে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীরের বিভিন্ন পেশি ও রগের প্রোটিনের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে জুড়ে যায়—একে বায়োকেমিস্ট্রিতে বলে Advanced Glycation End-products বা AGEs। এর ফলে টেনডনের স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে কোলাজেন শক্ত ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তখন অল্প চাপেই রগ ঘষা খেয়ে প্রদাহ তৈরি করে। আর ইউরিক অ্যাসিডের ছোট ছোট ক্রিস্টাল ওই সুড়ঙ্গে জমলেও মারাত্মক যন্ত্রণা হতে পারে।"
👱🏼♀️সুমীদেবীর মুখে খানিকটা স্বস্তির রেখা দেখা গেল, "তাহলে তেল মালিশ করা ভুল হয়েছে?"
👨🏻⚕️"একদমই ভুল হয়েছে," বুঝিয়ে বললাম, "প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশনের ওপর জোর করে মালিশ করলে ফোলা আরও বেড়ে যায়। গরম সেঁক নয়, এই অবস্থায় আইস প্যাক বা বরফের ঠান্ডা সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায়।"
👱🏼♀️মৌসুমীদেবী বেশ চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে এখন কী করব? ওষুধ খেয়ে এটা সারবে?"
👨🏻⚕️"একদম ধাপে ধাপে এগোব আমরা," আমি প্যাডে লিখতে শুরু করলাম:
১. ১. প্রথম ধাপ (বিশ্রাম ও সাপোর্ট): বুড়ো আঙুল আর কব্জিটাকে কিছুদিন স্থির রাখতে হবে। এর জন্য আপনাকে একটা বিশেষ বেল্ট দেব —Thumb Spica Splint। এটা পরলে রগ দুটো আর নড়াচড়া করে সুড়ঙ্গে ঘষা খাবে না।
২. বরফ সেঁক: ভুলেও গরম সেঁক বা তেল মালিশ করবেন না! দিনে তিনবার ১৫ মিনিট করে বরফের ঠান্ডা সেঁক দেবেন, যাতে ভেতরের প্রদাহ কমে।
৩. ওষুধ: ফোলা কমানোর জন্য কয়েক দিনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ চলবে। এবং এই এক্সারসাইজ যে গুলো দেখিয়ে দিচ্ছি করবেন কিন্তু I
👱🏼♀️সব শুনে মৌসুমীদেবী একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় বললেন, "ডাক্তারবাবু... যদি এতে না কমে?"
👨🏻⚕️"না কমলে তখন আমাদের পরবর্তী ধাপে যেতে হয়। সুড়ঙ্গের ঠিক যেখানে রগ আটকে যাচ্ছে, সেখানে খুব সূক্ষ্ম একটা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ইনজেকশন দেওয়া যায়—একে লোকাল টেনোসাইনোভিয়াল ইনজেকশন বলে।"
👱🏼♀️শুনেই ওনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল—"ওরে বাবা! কব্জিতে ইনজেকশন? খুব লাগবে তো ডাক্তারবাবু! অসহ্য ব্যথা হবে?"
👨🏻⚕️আমি হেসে ওনাকে আশ্বস্ত করলাম, "আরে না না, ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই! এটা তো আর অন্ধের মতো দেওয়া হয় না। আমরা আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনে স্পষ্ট চোখের সামনে মনিটরে দেখে নিই—রগটা ঠিক কোথায় ফুলে আছে, সুড়ঙ্গটা কতটুকু সরু। তারপর সেই জায়গাটা একদম অবশ করে, চুলের মতো পাতলা ছুঁচ দিয়ে ওষুধটা ঠিক কাঙ্ক্ষিত আবরণের ভেতর পৌঁছে দিই। পিঁপড়ে কামড়ানোর থেকেও কম লাগে! আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটা ইনজেকশনেই ম্যাজিকের মতো ভেতরের ফোলাটা চুপসে গিয়ে রগ একদম মুক্ত হয়ে যায়।"
👱🏼♀️মৌসুমীদেবী বুকভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "যাক, শুনে অনেক ভরসা পেলাম ডাক্তারবাবু। আমি আজ থেকেই বরফ সেঁক আর স্প্লিন্ট পরা শুরু করছি।"
👨🏻⚕️"একদম। আর বাচ্চাকে কোলে তোলার টেকনিকটাও একটু বদলে নিন—বুড়ো আঙুল দিয়ে টেনে তুলবেন না, দুই হাতের তালু দিয়ে বাচ্চার পিঠ ও পাঁজরের নিচে সাপোর্ট দিয়ে শরীরের কাছাকাছি এনে তুলবেন। দেখবেন, ক'দিনের মধ্যেই আঙুল আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে!"
fans