13/06/2026
হলি কাউ!! (পর্ব ৩)
বাংলাদেশে গরুর চামড়া খাওয়ার প্রচলন তেমন একটা ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে খাবার হিসেবে গরুর চামড়ার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এবং সত্যি বলতে, ব্যপারটি বেশ ভালো।
গরুর চামড়ায় ভালো পরিমাণ প্রোটিন থাকে। এতে কোলাজেনও থাকে, যা প্রাণীর ত্বক ও কানেকটিভ টিস্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ১০০ গ্রাম সেদ্ধ বা রান্না করা গরুর চামড়াতে প্রায় ২২৪.৬৫ ক্যালরি পাওয়া যায় যার মধ্যে, ৪৬.৯ গ্রাম প্রোটিন (প্রধানত কোলাজেন), ১.০৯ গ্রাম ফ্যাট, ৬.৮ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং ৪৩.৯ গ্রাম পানি। এছাড়াও পাওয়া যায় ক্যালসিয়াম (৬১ মি.গ্রা.), আয়রন (৪.৩ মি.গ্রা.), জিঙ্ক (৬.৭৯ মি.গ্রা.), ম্যাগনেসিয়াম (১২ মি.গ্রা.) এবং পটাসিয়ামের (৩৬ মি.গ্রা.) মতো গুরুত্বপূর্ণ মিনারেল।
অনেকেই দাবি করছেন গরুর চামড়া খেলে স্তন টানটান হয়, ঝুলে যাওয়া কমে, কিংবা স্তনের আকৃতি উন্নত হয়। এই দাবির পেছনের যুক্তি হলো গরুর চামড়ায় কোলাজেন ও ইলাস্টিন থাকে, আর স্তনের দৃঢ়তা বজায় রাখতেও কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ভূমিকা আছে।
প্রশ্ন হলো, বিজ্ঞান কি এই ধারণাকে সমর্থন করে?
প্রথমে বুঝে নেওয়া যাক স্তন ঝুলে যায় কেন।
স্তনের আকৃতি ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে ত্বক, কানেকটিভ টিস্যু, ফ্যাট এবং কুপার'স লিগামেন্ট নামক একটি সাপোর্টিং স্ট্রাকচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বৃদ্ধি, গর্ভধারণ, স্তন্যদান, ওজনের বড় ওঠানামা, ধূমপান, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং স্বাভাবিক বার্ধক্যজনিত পরিবর্তনের ফলে ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিন ধীরে ধীরে কমে যায় এবং সাপোর্টিং টিস্যুগুলোও শিথিল হতে থাকে। এর ফলেই স্তন ঝুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
আমরা যখন গরুর চামড়া খাই, তখন তার কোলাজেন ও ইলাস্টিন হুবহু ওই অবস্থায়ই আমাদের শরীরে প্রবেশ করে না। হজমের সময় এগুলো ছোট ছোট অ্যামিনো অ্যাসিড ও পেপটাইডে ভেঙে যায়। এরপর শরীর সেই কাঁচামালকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করে। অর্থাৎ গরুর চামড়ার ইলাস্টিন খেয়েছেন মানেই সেই ইলাস্টিন আপনার স্তনে গিয়ে জমা হবে এমন কোনো পরিচিত জৈবিক প্রক্রিয়া নেই। স্তনের ত্বক ও সংযোজক কলায় কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ভূমিকা থাকলেও গরুর চামড়ার কোলাজেন বা ইলাস্টিন খেয়ে সরাসরি সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট নিয়ে কিছু গবেষণায় ত্বকের আর্দ্রতা, স্থিতিস্থাপকতা এবং বলিরেখার ক্ষেত্রে সীমিত থেকে মাঝারি মাত্রার উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণা মূলত কোলাজেন পেপটাইড সাপ্লিমেন্ট নিয়ে, গরুর চামড়া নিয়ে নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্তনের আকৃতি, দৃঢ়তা বা ঝুলে যাওয়ার ওপর গরুর চামড়া খাওয়ার প্রভাব নিয়ে কোনো শক্তিশালী মানব গবেষণা বর্তমানে নেই। অতএব-
- "কোলাজেন শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ" এটি সত্য।
- "গরুর চামড়ায় কোলাজেন আছে" এটিও সত্য।
- কিন্তু "গরুর চামড়া খেলে স্যাগি ব্রেস্ট ঠিক হয়ে যাবে"এই দাবির পক্ষে বর্তমানে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
গরুর চামড়া একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ, কোলাজেনসমৃদ্ধ এবং অনেকের কাছে সুস্বাদু খাবার। কিন্তু এটিকে "ব্রেস্ট রি-শেপিং সুপারফুড" হিসেবে উপস্থাপন করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে নেই।
হলি কাউ সিরিজ এখানেই সমাপ্ত হলো, সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ। এই সিরিজ থেকে আপনি কি কি শিখলেন তা অবশ্যই জানাবেন।